আজকাল ওয়েবডেস্ক: পৃথিবীকে সূর্যের ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি থেকে সুরক্ষা দেয় ওজোন স্তর। বহু বছর ধরেই বিজ্ঞানীরা জানতেন যে ১৯৮০-এর দশকে অ্যান্টার্কটিকার উপর ওজোন স্তরে বড় ধরনের ছিদ্র তৈরি হয়েছিল। তবে নতুন একটি গবেষণা জানাচ্ছে, ওজোন স্তরের ক্ষয় আসলে বিজ্ঞানীদের ধারণার তুলনায় অনেক আগেই শুরু হয়েছিল। এই আবিষ্কার পৃথিবীর জলবায়ু ও পরিবেশের ইতিহাস সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে গবেষকদের।
গবেষণায় দেখা গেছে, বায়ুমণ্ডলের ওজোন স্তর ধীরে ধীরে পাতলা হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল সেই সময়েরও আগে, যখন বিজ্ঞানীরা প্রথমবার এই সমস্যার অস্তিত্ব স্পষ্টভাবে শনাক্ত করেন। অর্থাৎ ওজোন স্তরের অবনতি দীর্ঘদিন ধরেই চলছিল, কিন্তু সে সময় পর্যাপ্ত পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা এবং প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতার কারণে বিষয়টি ধরা পড়েনি।
ওজোন স্তর পৃথিবীর স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে অবস্থিত একটি গ্যাসীয় স্তর, যা সূর্যের ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মির বড় অংশ শোষণ করে। এই স্তর দুর্বল হয়ে গেলে ত্বকের ক্যানসার, চোখের ছানি, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস এবং কৃষি ও সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই ওজোন স্তরের স্বাস্থ্য পৃথিবীর জীবজগতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিংশ শতাব্দীতে ক্লোরোফ্লুরোকার্বন এবং অন্যান্য ওজোন-ধ্বংসকারী রাসায়নিকের ব্যাপক ব্যবহারই ওজোন স্তর ক্ষয়ের প্রধান কারণ ছিল। এই রাসায়নিকগুলি রেফ্রিজারেটর, এয়ার কন্ডিশনার, অ্যারোসল স্প্রে এবং বিভিন্ন শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত হতো। বায়ুমণ্ডলে পৌঁছে এগুলি ক্লোরিন ও ব্রোমিন নির্গত করে, যা ওজোন অণুকে ভেঙে দেয়।
নতুন গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, অতীতের বায়ুমণ্ডলীয় তথ্য এবং উন্নত কম্পিউটার মডেল বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পেরেছেন যে ওজোন স্তরের অবনতি বহু বছর ধরে নীরবে চলছিল। পরে ১৯৮০-এর দশকে যখন অ্যান্টার্কটিকার উপরে বিশাল ওজোন ছিদ্র আবিষ্কৃত হয়, তখন বিষয়টি বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে।
এই সংকট মোকাবিলায় ১৯৮৭ সালে মন্ট্রিয়ল প্রোটোকল গৃহীত হয়, যার মাধ্যমে বিভিন্ন ওজোন-ধ্বংসকারী রাসায়নিকের উৎপাদন ও ব্যবহার ধাপে ধাপে বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি বিশ্বের সবচেয়ে সফল আন্তর্জাতিক পরিবেশ চুক্তিগুলির একটি। এর ফলে বর্তমানে ওজোন স্তর ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধারের পথে রয়েছে।
তবে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলছেন, ওজোন স্তরের পুনরুদ্ধার একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। ভবিষ্যতেও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, গবেষণা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং বায়ুমণ্ডলের রাসায়নিক পরিবর্তনের ওপরও নজর রাখতে হবে।
নতুন এই গবেষণা প্রমাণ করে যে পরিবেশগত পরিবর্তন অনেক সময় দীর্ঘদিন অদৃশ্যভাবে চলতে পারে, যা পরে বড় সংকটে পরিণত হয়। তাই বিজ্ঞানীদের মতে, পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল এবং পরিবেশের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, উন্নত গবেষণা এবং বিশ্বের সহযোগিতাই ভবিষ্যতে এমন সংকট মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।















