আজকাল ওয়েবডেস্ক: ট্রাম্পের হুমকির পর মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থা আরও জটিল আকার দারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা। এই পরিস্থিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারী প্রস্তাবিত ৪৫ দিনের যুদ্ধবিরতির শর্তাবলি চূড়ান্ত করতে জোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। নেপথ্যের এই আলোচনা সম্পর্কে অবগত একাধিক সূত্র 'অ্যাক্সিওস'-কে জানিয়েছে যে, এই প্রচেষ্টা বর্তমানে জারি থাকলেও, সমাধানে পৌঁছানোর সুযোগ বা সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।

আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে একটি ছোট চুক্তিতে পৌঁছানোর সম্ভাবনাও অত্যন্ত ক্ষীণ। তবুও, কূটনীতিকরা এটিকে একটি বড় ধরনের সংঘাত এড়ানোর শেষ সুযোগ হিসেবে দেখছেন। 

সূত্রের খবর, মধ্যস্থতাকারীরা দুই-স্তরে চুক্তি তৈরির চেষ্টা করছেন। প্রথম ধাপে প্রস্তাব ৪৫ দিনের যুদ্ধবিরতি, যার মধ্যে স্থায়ী শান্তিচুক্তি নিয়ে আলোচনা চলবে। আলোচনা এগোলে এই সময়সীমা আরও বাড়ানো হতে পারে।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তেহরানকে হুঁশিয়ারি দিয়ে সময়সীমা বা 'ডেডলাইন' নির্ধারণ করেছেন। ফলে যুদ্ধবিরতি অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। 

মূলত সোমবার সন্ধ্যায় দ্বিতীয় দফার ডেডলাইন শেষ হওয়ার কথা থাকলেও, তা ২০ ঘণ্টা বাড়িয়ে মঙ্গলবার ইস্টার্ন টাইম রাত ৮টা পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। ট্রাম্প জানিয়েছেন যে, আলোচনা এখনও চলছে এবং একটি চুক্তিতে পৌঁছানো এখনও সম্ভব। তবে পাশাপাশি তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে জানান, আলোচনা ব্যর্থ হলে ইরানের বিরুদ্ধে ব্যাপক সামরিক অভিযান চালানো হবে।

'দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল'-এর সঙ্গে সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, "যদি তারা সমঝোতায় না আসে—যদি তারা পরিস্থিতি অচল করে রাখতে চায়—তবে তারা পুরো দেশের প্রতিটি বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং অন্যান্য সব পরিকাঠামো হারাবে।" গতকাল পাল্টা আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ইরানকে আরও সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন যে, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তাদের অবশ্যই হরমুজ প্রণালী খুলে দিতে হবে, অন্যথায় "তারা নরক দেখবে।" 

নেপথ্যে, পাকিস্তান, মিশর এবং তুরস্কের মাধ্যমে মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। পাশাপাশি ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ইরানের বিদেশ মন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির মধ্যে সরাসরি বার্তা আদান-প্রদানও চলছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা 'অ্যাক্সিওস'-কে জানিয়েছেন যে, ওয়াশিংটন গত কয়েক দিনে বেশ কিছু প্রস্তাব পেশ করেছে, কিন্তু তেহরান এখন পর্যন্ত সেগুলোর কোনোটিই গ্রহণ করেনি।

আলোচনায় যে রূপরেখাটি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, তাতে দুই-ধাপ বিশিষ্ট একটি ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে। প্রথম ধাপে ৪৫ দিনের একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা হবে; এই সময়ের মধ্যে উভয় পক্ষ ইরান এবং সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে সংঘাতের স্থায়ী অবসানের লক্ষ্যে আলোচনার চেষ্টা চালাবে। আলোচনার জন্য যদি আরও সময়ের প্রয়োজন হয়, তবে এই সাময়িক যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো যেতে পারে। দ্বিতীয় ধাপের লক্ষ্য হবে একটি ব্যাপকতর চুক্তিকে আনুষ্ঠানিক রূপ দেওয়া, যার মাধ্যমে যুদ্ধের সম্পূর্ণ অবসান ঘটানো সম্ভব হবে।

তবে, আলোচনার মূল ও জটিল বিষয়গুলো এখনও অমীমাংসিতই রয়ে গিয়েছে। মধ্যস্থতাকারীরা মনে করেন যে, হরমুজ প্রণালীর পূর্ণাঙ্গ উন্মুক্তকরণ এবং ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান (তা মজুদ অপসারণের মাধ্যমেই হোক কিংবা লঘুকরণের মাধ্যমেই হোক) সম্ভবত কেবল একটি চূড়ান্ত চুক্তির অংশ হিসেবেই অর্জন করা সম্ভব। প্রাথমিক যুদ্ধবিরতি চলাকালীন তা সম্ভব নয়।

ইরানি কর্মকর্তারা এ বিষয়ে গভীর সংশয় প্রকাশ করেছেন এবং সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন যে, তারা গাজা বা লেবাননের মতো পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি চান না। গাজায় যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও নতুন করে হামলা চালানো ঠেকানো সম্ভব হয়নি। 'অ্যাক্সিওস'-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, তেহরান এমন কোনও ব্যবস্থার বিনিময়ে তাদের প্রধান দরকষাকষির হাতিয়ার (অর্থাৎ হরমুজ প্রণালীতে প্রবেশের নিয়ন্ত্রণ এবং ইউরেনিয়াম মজুদ) হাতছাড়া করতে নারাজ, যাকে তারা কেবল একটি স্বল্পমেয়াদী বন্দোবস্ত হিসেবেই দেখছে।

আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকি অত্যন্ত প্রকট। মধ্যস্থতা প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তারা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন যে, ইরানের জ্বালানি পরিকাঠামো লক্ষ্য করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা ইজরায়েলের যেকোনও হামলাই, উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল ও জল পরিশোধন কেন্দ্রগুলোকে নিশানা করে কঠোর প্রতিশোধমূলক হামলার সূত্রপাত ঘটাতে পারে, যার আঞ্চলিক পরিণতি হতে পারে অত্যন্ত বিপর্যয়কর।

আলোচনা অব্যাহত থাকা সত্ত্বেও, তেহরানের পক্ষ থেকে প্রচারিত জনবার্তা বা বার্তাগুলো ছিল অনমনীয়। ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর নৌ শাখা ঘোষণা করেছে যে, হরমুজ প্রণালীর পরিস্থিতি "কখনওই" যুদ্ধের পূর্ববর্তী অবস্থায় ফিরে যাবে না, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের ক্ষেত্রে।

'দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল'-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাত্র কয়েক দিন আগেই ইরান পাকিস্তান-নেতৃত্বাধীন মধ্যস্থতাকারী দলের একটি প্রতিনিধি দলকে জানিয়ে দিয়েছে যে, তারা ইসলামাবাদে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে অনিচ্ছুক, তারা ওয়াশিংটনের এই প্রস্তাবকে 'অগ্রহণযোগ্য' হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।