আজকাল ওয়েবডেস্ক: ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) দাবি করেছে যে, তারা মার্কিন বিমানবাহী রণতরী 'ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন'-এর ওপর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। তাদের আরও দাবি, এই হামলায় মার্কিন রণতরীটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং আঞ্চলিক জলসীমা থেকে পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে। সিবিএস নিউজের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, আমেরিকা অবশ্য এই দাবির সত্যতা নিশ্চিত করেনি। উল্টে ওয়াশিংটন জানিয়েছে যে, একটি আগ্রাসি ইরানি জাহাজের এগিয়ে আসার জবাবে তাদের নৌবাহিনী পাল্টা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল।

ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম 'প্রেস টিভি'-র তথ্য অনুসারে, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের নৌবাহিনী ওমান সাগরের নিকটবর্তী জলসীমায় অবস্থানরত ওই মার্কিন রণতরীটিকে লক্ষ্য করে একটি 'সুনির্দিষ্ট ও নিখুঁত অভিযান'  পরিচালনা করে। ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে, এই হামলায় অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে। যা ইরানের সামুদ্রিক সীমানা থেকে প্রায় ৩৪০ কিলোমিটার দূরে অবস্থানরত রণতরীটিতে আঘাত হানে।

'প্রেস টিভি'-তে প্রকাশিত এবং ইরানের 'পবিত্র নবীর কেন্দ্রীয় সদর দপ্তর' উদ্ধৃত করে প্রচারিত এক বিবৃতিতে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস দাবি করেছে যে, এই হামলার ফলে রণতরীটি অকার্যকর হয়ে পড়ে এবং এর অন্তর্ভুক্ত স্ট্রাইক গ্রুপটি (হামলাকারী দল) দ্রুতগতিতে ওই এলাকা ত্যাগ করতে বাধ্য হয়।

ইরানি কর্তৃপক্ষ এই অভিযানকে তেহরানের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং এই অঞ্চলে বিদেশি সামরিক চাপ প্রতিহত করার প্রচেষ্টারই একটি অংশ হিসেবে অভিহিত করেছে।

পারমাণবিক শক্তিসম্পন্ন 'নিমিতজ-শ্রেণির' (১০টি পারমাণবিক শক্তিসম্পন্ন বিমানবাহী মার্কিন নৌবাহিনীর রণতরী, যা ১৯৭৫ সাল থেকে পরিষেবায় নিয়োজিত। এগুলো বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম যুদ্ধজাহাজ) এই বিমানবাহী রণতরীটি মার্কিন নৌবাহিনীর একটি 'স্ট্রাইক গ্রুপের' অংশ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্য এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে মার্কিন সামরিক অভিযানগুলোতে সহায়তা প্রদানের লক্ষ্যে মোতায়েন করা হয়েছে।

ইরানি কর্মকর্তারা এই হামলায় ঠিক কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কিংবা কোনও হতাহতের ঘটনা ঘটেছে কি না - সে বিষয়ে বিস্তারিত কোনও তথ্য প্রকাশ করেননি।

এর পাশাপাশি, আইআরজিসি পৃথক এক বিবৃতিতে জানিয়েছে যে- তারা ওমানের 'মিনা সালমান' এলাকায় অবস্থিত মার্কিন নৌবাহিনীর একটি ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। উল্লেখ্য, এই ঘাঁটিতেই মার্কিন নৌবাহিনীর 'পঞ্চম নৌবহর'-এর সদর দপ্তর অবস্থিত।

ওই বিবৃতি অনুযায়ী, দু'টি ধাপে চালানো এই হামলায় মার্কিন ঘাঁটির বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুকে নিশানা করা হয়। এর মধ্যে ছিল - ড্রোন-বিধ্বংসী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ড্রোন সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ এলাকা, সহায়ক সরঞ্জাম এবং জ্বালানি তেলের ট্যাঙ্কসমূহ।

ইরানি কর্মকর্তারা দাবি করেছেন যে, এই অভিযানের ফলে ওই ঘাঁটিতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক পরিকাঠামো এবং সেখানে মোতায়েনকৃত সেনাদের ওপর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

আইআরজিসি আরও জানিয়েছে যে, এই হামলাগুলো অত্যাধুনিক সামরিক হুমকি মোকাবিলায় তাদের নৌবাহিনীর সক্ষমতাকে স্পষ্টভাবে প্রমাণ করেছে। একই সঙ্গে তারা হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, ইসলামিক প্রজাতন্ত্রকে ভয়ভীতি প্রদর্শনের যেকোনও প্রচেষ্টার সমুচিত ও কঠোর জবাব দেওয়া হবে।

ইরানের নতুন বিপ্লবী নেতা মোজতবা খামেনেইর সাম্প্রতিক কিছু মন্তব্যের পরপরই আইআরজিসি-এর পক্ষ থেকে এই দাবিগুলো সামনে আনা হল। এর আগে মোজতবা খামেনেই দেশের আত্মরক্ষার দৃঢ় সংকল্পের ওপর জোর দিয়েছিলেন এবং হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন যে, শত্রুপক্ষ যদি কোনও বিদ্বেষমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করে, তবে তার এমন কঠোর জবাব দেওয়া হবে - যা শত্রুদের শেষমেশ 'অনুশোচনা' করতে বাধ্য করবে। 
ইউএসএস লিঙ্কন নিয়ে ইরানের দাবি অস্বীকার আমেরিকার:তবে, বিমানবাহী রণতরীটির ওপর ইরানের কোনও সফল হামলার বিষয়টি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিশ্চিত করেনি।

সিবিএস নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে- চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে একটি ইরানি জাহাজ ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কনের খুব কাছাকাছি চলে এসেছিল। যার পরিপ্রেক্ষিতে মার্কিন বাহিনী পাল্টা ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয়।

এই ঘটনা সম্পর্কে অবগত দু'জন মার্কিন কর্মকর্তা সংবাদমাধ্যমটিকে জানান যে, মার্কিন নৌবাহিনীর একটি জাহাজ 'মার্ক-৪৫'  মডেলের পাঁচ-ইঞ্চি নৌ-কামানের সাহায্যে এগিয়ে আসা ওই জাহাজটিকে লক্ষ্য করে গুলি চালানোর চেষ্টা করেছিল, যদিও সেই গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়।

কর্মকর্তারা আরও জানান যে, এরপর 'হেলফায়ার' ক্ষেপণাস্ত্রে সজ্জিত একটি হেলিকপ্টার ওড়ানো হয় এবং দু'টি ক্ষেপণাস্ত্রের সাহায্যে ইরানি জাহাজটিতে আঘাত হানে। ইরানি জাহাজ এবং নাবিকদের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে এখনও বিস্তারিত কিছু জানা যায়নি।

সিবিএস নিউজ মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে জানিয়েছে যে, ঘটনাটি সম্ভবত তখন ঘটেছিল যখন ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন আরব সাগরে তার সহযোগী জাহাজগুলোর (যার মধ্যে গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার ইউএসএস স্প্রুয়েন্স এবং ইউএসএস মাইকেল মারফিও অন্তর্ভুক্ত ছিল) সঙ্গে যৌথভাবে টহল কার্যক্রমে ছিল। 

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, ওই অঞ্চলে মার্কিন নৌবাহিনীর আরও বেশ কয়েকটি ডেস্ট্রয়ার জাহাজও তখন টহল দিচ্ছিল।

ঠিক কোন হেলিকপ্টারটি এই হামলা চালিয়েছিল, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি; তবে মার্কিন নৌবাহিনীর এমএইচ-৬০আর 'সি-হক' এবং মেরিন কর্পসের এএইচ ১জেড 'ভাইপার' —উভয় ধরনের আক্রমণকারী হেলিকপ্টারই হেলফায়ার ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপে সক্ষম।

এই ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল, যার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেই ইরাকে ইরান মদতপুষ্ট একটি 'ইসলামিক প্রতিরোধ গোষ্ঠী' মার্কিন বিমানবাহিনীর একটি বিমান ধ্বংস করেছিল। ওই বিমানটিতে অন্তত পাঁচজন ক্রু সদস্য ছিলেন। ধ্বংস হওয়া বিমানটি ছিল একটি বোয়িং কেসি-১৩৫ 'স্ট্রাটোট্যাঙ্কার' - যা মার্কিন সামরিক বাহিনী পরিচালিত একটি আকাশপথে জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান।

পরস্পরবিরোধী এই বিবরণগুলো উপসাগর এবং আরব সাগরের কৌশলগত জলসীমায় ইরান ও আমেরিকার মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার বিষয়টিকেই স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলে। আর এই অঞ্চলটিই বর্তমানে সামরিক তৎপরতা এবং ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সাম্প্রতিক এই সংঘাত বা মুখোমুখি অবস্থান সম্পর্কে কোনও পক্ষই এখন পর্যন্ত বিস্তারিত কোনও সামরিক বা অভিযান সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করেনি।