আজকাল ওয়েবডেস্ক: পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের উত্তেজনা আরও বেড়ে গেল। সংঘাতের ষষ্ঠ দিনে বৃহস্পতিবার ভোরে আবারও ইজরায়েলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে ইরান। একাধিক শহরে সাইরেন বেজে ওঠে এবং মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে ছুটে যায়। একই সঙ্গে অঞ্চলজুড়ে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার ভোরে ইজরায়েলের দিকে একটি ভারী খোররামশাহর-৪ ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে। এই ক্ষেপণাস্ত্র প্রায় এক টন ওয়ারহেড বহন করতে পারে এবং এর পাল্লা প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার। গত শনিবার থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধের পর এটিকে সংঘাতের অন্যতম শক্তিশালী আক্রমণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ইজরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তেল আভিভ এবং জেরুজালেমসহ একাধিক শহরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সতর্কবার্তা জারি করা হয়। সাইরেন বাজতেই মানুষকে নিরাপদ স্থানে চলে যেতে বলা হয়। এর কিছুক্ষণ আগেই ইজরায়েল ঘোষণা করেছিল যে তারা লেবাননের রাজধানী বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলে হামলা চালিয়েছে। ওই এলাকায় ইরান-সমর্থিত সংগঠন হেজবোল্লাহর  ঘাঁটি রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

সংঘাত আরও তীব্র হয়ে ওঠে বুধবার, যখন আমেরিকা এবং ইজরায়েল একযোগে ইরানের বিভিন্ন স্থানে বড় আকারের বিমান হামলা চালায়। এই হামলার মাত্রা এতটাই বড় ছিল যে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানায়, দেশের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনেই-এর শোকানুষ্ঠান আপাতত স্থগিত করা হয়েছে। যুদ্ধের শুরুতেই তিনি নিহত হয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে।

এই যুদ্ধের সূচনা হয় শনিবার, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েল যৌথভাবে ইরানের নেতৃত্ব, ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার এবং পারমাণবিক কর্মসূচিকে লক্ষ্য করে হামলা শুরু করে। তখনই ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল যে ইরানের সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করাও এই অভিযানের একটি সম্ভাব্য লক্ষ্য হতে পারে। তবে যুদ্ধের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও সময়সীমা বারবার বদলাচ্ছে, ফলে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের আশঙ্কা বাড়ছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প  বুধবার বলেন, যুদ্ধক্ষেত্রে মার্কিন সেনাবাহিনী “খুব ভাল কাজ করছে”। একই দিনে মার্কিন সিনেটে রিপাবলিকান আইন প্রণেতারা একটি প্রস্তাব খারিজ করে দেন, যাতে এই যুদ্ধ বন্ধ করার আহ্বান জানানো হয়েছিল। যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ছে গোটা অঞ্চলে। ইরান থেকে বাহরাইন, কুয়েত ও ইজরায়েলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তুরস্ক জানিয়েছে, ন্যাটোর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিষ্ক্রিয় করেছে, যা তুরস্কের আকাশসীমায় ঢোকার আগেই ধ্বংস করা হয়।

এখন পর্যন্ত এই সংঘাতে ইরানে এক হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। লেবাননে নিহতের সংখ্যা ৭০-এর বেশি এবং ইজরায়েলে মারা গেছে অন্তত এক ডজন মানুষ। যুদ্ধের প্রভাব শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নেই। তেল ও গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় বিশ্ববাজারেও চাপ বাড়ছে। পারস্য উপসাগরের প্রবেশদ্বার হরমুজ প্রণালী  দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল পরিবহন হয়। এই পথে হামলার আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলও ধীর হয়ে পড়েছে।

বৃহস্পতিবার ভোরে কুয়েত উপকূলে একটি বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। ব্রিটিশ সামরিক বাহিনী পরিচালিত ইউনাইটেড কিংডম মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস জানিয়েছে, একটি তেলবাহী জাহাজ হামলার শিকার হয়ে থাকতে পারে, যদিও ঘটনার সুনির্দিষ্ট কারণ এখনও নিশ্চিত করা হয়নি।

এদিকে মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব Pete Hegseth জানিয়েছেন, মঙ্গলবার রাতে ভারত মহাসাগরে মার্কিন সাবমেরিন থেকে ছোড়া একটি টর্পেডোতে ইরানের একটি যুদ্ধজাহাজ ডুবে যায়। শ্রীলঙ্কার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ওই জাহাজ থেকে ৩২ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে এবং সমুদ্রে ৮৭টি মৃতদেহ পাওয়া গেছে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে এখন বাড়ছে আতঙ্ক। কাতারের রাজধানী দোহায় মার্কিন দূতাবাসের আশপাশের এলাকা থেকে বাসিন্দাদের সাময়িকভাবে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। দুবাই শহরের আকাশে বৃহস্পতিবার সকালে যুদ্ধবিমান উড়তে দেখা গেছে।

পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে। ইরানের আধাসামরিক বাহিনী Islamic Revolutionary Guard Corps ইতিমধ্যেই সতর্ক করে দিয়েছে—যুদ্ধ চলতে থাকলে গোটা অঞ্চলের সামরিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো “সম্পূর্ণ ধ্বংস” হয়ে যেতে পারে।