আজকাল ওয়েবডেস্ক: মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার পর যুদ্ধের অভিঘাতে কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে ইরানের অর্থনীতি। রাজধানী তেহরানসহ দেশের বিভিন্ন শহরে একদিকে চলছে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, অন্যদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। সবচেয়ে বেশি ধাক্কা খেয়েছে খাদ্যপণ্যের বাজার—বিশেষ করে দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইরানে খাদ্যদ্রব্যের মূল্যস্ফীতি ইতিমধ্যেই ১০০ শতাংশ ছুঁয়েছে। ডিম ও দুগ্ধজাত পণ্যের দাম বেড়েছে প্রায় ১০৮ শতাংশ। ফলে বহু পরিবারের পক্ষে প্রতিদিন দুধ কেনাও কঠিন হয়ে উঠছে। রাজধানী তেহরানের অনেক বাসিন্দাই বলছেন, যুদ্ধের আগে থেকেই দাম বাড়ছিল, কিন্তু সাম্প্রতিক হামলার পর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। তেহরানের এক বাসিন্দা মারজান জানান, বাজারে এখনও বেশিরভাগ জিনিস পাওয়া যাচ্ছে, কিন্তু দাম এতটাই বেড়ে গেছে যে সাধারণ মানুষের পক্ষে সামাল দেওয়া কঠিন। তাঁর কথায়, “দুধ, ডিম, রুটি—সবকিছুর দাম বাড়ছে। পরিবারের খরচ সামলানো এখন খুবই কঠিন হয়ে পড়েছে।”
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, দুর্বল অর্থনীতি এবং যুদ্ধ পরিস্থিতি—এই তিনের চাপ একসঙ্গে এসে পড়েছে ইরানের বাজারে। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে বহু বিদেশি পণ্য ও কাঁচামাল আমদানি আগেই কঠিন হয়ে পড়েছিল। এখন যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সরবরাহ ব্যবস্থাও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
এর ফলে শুধু খাদ্যপণ্যই নয়, ওষুধের বাজারেও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। অনেক ওষুধের দাম দ্রুত বাড়ছে, কিছু ওষুধ আবার বাজারে মিলছেই না। বিদেশি ওষুধ প্রায় অদৃশ্য হয়ে গেছে, অনেক ক্ষেত্রে কেবল দেশীয় সংস্করণ পাওয়া যাচ্ছে। যুদ্ধের আগেই ইরানের মুদ্রা রিয়ালের মূল্য প্রায় সর্বনিম্ন স্তরে নেমে গিয়েছিল। এক ডলারের বিপরীতে প্রায় ১৬ লাখ রিয়াল লেনদেন হচ্ছিল। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বাজারে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে, শেয়ারবাজারে ধস নেমেছে এবং সোনার দাম দ্রুত বাড়ছে।
সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে জনগণকে নগদ ভর্তুকি দিচ্ছে এবং কিছু প্রয়োজনীয় জিনিসের ওপর বিশেষ সহায়তা চালু করেছে। কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে এই সাহায্য খুবই সীমিত এবং ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির সামনে তা প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়ছে। যুদ্ধের প্রভাব শুধু ইরানের অভ্যন্তরেই সীমাবদ্ধ নেই। ইরানের উপকূলের কাছে অবস্থিত হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারেও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এই পথ দিয়ে বিশ্বের বিপুল পরিমাণ তেল, গ্যাস এবং সার পরিবাহিত হয়।
ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও সারের দাম বাড়তে শুরু করেছে, যা ভবিষ্যতে খাদ্যপণ্যের দাম আরও বাড়িয়ে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে ইরানের অর্থনীতি ভয়াবহ সংকটে পড়তে পারে। আর তার প্রথম আঘাত পড়বে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে—যেখানে এক গ্লাস দুধও হয়ে উঠতে পারে বিলাসিতা।
