আজকাল ওয়েবডেস্ক: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলা আরও তীব্র হওয়ার পর রবিবার ভোরে ইরানের রাজধানী তেহরানের কাছাকাছি একাধিক জ্বালানি ডিপোতে ভয়াবহ আগুন ধরে যায়। আকাশে আগুনের লেলিহান শিখা ও ঘন কালো ধোঁয়ায় রাতের আকাশ কমলা রঙে ঢেকে যায়। বাসিন্দাদের বর্ণনায়, রাত যেন হঠাৎ দিনের মতো উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল, আবার ধোঁয়ার ঘন স্তরে সকাল হওয়ার পরও শহর অন্ধকারে ঢেকে পড়ে।

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা যেসব জ্বালানি ডিপোতে হামলা চালিয়েছে সেগুলো ইরানের সামরিক বাহিনী ব্যবহার করছিল। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক পরিকাঠামো—বিশেষ করে বিপ্লবী গার্ড বাহিনী, বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির ওপর হামলা বাড়িয়েছে বলে এক মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা জানান।

যুদ্ধ শুরু হওয়ার এক সপ্তাহেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সংঘাত থামার কোনও লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বরং উভয় পক্ষই এখন গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামোর ওপর হামলা জোরদার করছে, যার ফলে গোটা মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে কোটি কোটি মানুষের ওপর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে ইরান স্থিতিশীলতার বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করছে। দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশন জানিয়েছে, শীর্ষ ধর্মীয় নেতারা নতুন সর্বোচ্চ নেতার নাম চূড়ান্ত করার কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন। গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রথম দফা হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ আলি খামেনেই  নিহত হন বলে দাবি করা হয়েছিল। তবে সম্ভাব্য উত্তরসূরির নাম এখনও প্রকাশ করা হয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েল নতুন নেতা হত্যার হুমকি দেওয়ায় এই বিষয়ে চরম সতর্কতা বজায় রাখা হচ্ছে।

তেহরানের এক বাসিন্দা, নিরাপত্তার কারণে যিনি নিজের নাম গোপন রাখতে চান, জানান, “আগুনের আলোয় মনে হচ্ছিল রাতটা যেন দিন হয়ে গেছে। আবার ধোঁয়ার কারণে সকালে শহরটা আবার অন্ধকারে ঢেকে যায়।” অন্যদিকে ইরানও পাল্টা হামলা চালাচ্ছে। পারস্য উপসাগর ও ইসরায়েলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের একাধিক দফা হামলা চালানো হয়েছে। এর মধ্যে কিছু হামলায় বেসামরিক পরিকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বাহরাইনের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ইরানের হামলায় একটি ডেসালিনেশন প্ল্যান্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উপসাগরীয় দেশগুলোর পানীয় জলের প্রধান উৎস এই সমুদ্রের জল লবণমুক্ত করার প্ল্যান্ট। কুয়েতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রকও জানিয়েছে, ড্রোন হামলায় কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের জ্বালানি সংরক্ষণ ট্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সীমান্তে দুইজন নিরাপত্তারক্ষী নিহত হয়েছেন। এতে উপসাগরীয় অঞ্চলে মোট মৃতের সংখ্যা অন্তত ১৪-তে পৌঁছেছে।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু শনিবার রাতে এক ভাষণে বলেন, ইরানে তাদের “আরও বহু লক্ষ্যবস্তু” রয়েছে এবং এই অভিযান ইসলামী প্রজাতন্ত্রের শাসনব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করার লক্ষ্যেই পরিচালিত হচ্ছে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের দাবি জানিয়েছেন, যা তেহরান সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। ইরানের এক শীর্ষ নেতা বলেছেন, আয়াতোল্লাহর মৃত্যুর প্রতিশোধ নেওয়া হবে।

যুদ্ধের পরবর্তী পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র কী পদক্ষেপ নেবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, আপাতত কুর্দি বাহিনীকে সংঘাতে জড়ানো হবে না, কারণ এতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। তবে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে ভবিষ্যতে প্রয়োজনে ইরানে স্থলবাহিনী পাঠানোর বিষয়টিও বিবেচনা করা হতে পারে, বিশেষ করে দেশটির পারমাণবিক স্থাপনাগুলো দখলের জন্য।

এদিকে হতাহতের সংখ্যাও ক্রমেই বাড়ছে। ইরানের রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি সপ্তাহের শুরুতে জানিয়েছিল, প্রায় ৮০০ মানুষ নিহত হয়েছে। তবে জাতিসংঘে ইরানের রাষ্ট্রদূত শুক্রবার দাবি করেন, নিহতের সংখ্যা ইতিমধ্যে ১,৩০০ ছাড়িয়ে গেছে। সংঘাতের প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও পড়তে শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রেও জ্বালানির দাম বাড়ছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে সেখানে গড়ে পেট্রলের দাম প্রায় ১৬ শতাংশ বেড়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সংঘাত দ্রুত থামার সম্ভাবনা খুব কম। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার একটি প্রতিবেদনে আগেই সতর্ক করা হয়েছিল যে বড় ধরনের সামরিক আক্রমণ হলেও ইরানের ধর্মতান্ত্রিক সরকারকে সহজে পতন ঘটানো সম্ভব নয়। ফলে যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে এর প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারেও গভীরভাবে পড়তে পারে।