আজকাল ওয়েবডেস্ক: ইরানে কঠোর ইসলামী আইন অনুযায়ী যৌন আচরণ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। কিন্তু বাস্তবে দেশটিতে এক বিস্তৃত গোপন যৌন ব্যবসা ধীরে ধীরে বিস্তার লাভ করছে, যার বড় অংশ পরিচালিত হচ্ছে ‘ম্যাসাজ সার্ভিস’-এর আড়ালে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশেষত ইনস্টাগ্রাম ও টেলিগ্রামে এই ধরনের পরিষেবার বিজ্ঞাপন ক্রমশ বাড়ছে। একদিকে যেখানে হিজাব আইন ভঙ্গের অভিযোগে ,মহিলাদের গ্রেপ্তার বা হিংসার মুখে পড়তে হয়, অন্যদিকে একই সমাজে গোপনে যৌন ব্যবসার প্রসার ইসলামী প্রজাতন্ত্রের ঘোষিত নৈতিকতার সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির একটি গভীর দ্বন্দ্বকে সামনে আনছে।

সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বহু ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট নিজেদের ম্যাসাজ থেরাপি পরিষেবা হিসেবে প্রচার করলেও, বাস্তবে তার আড়ালে যৌন ব্যবসার নেটওয়ার্ক সক্রিয় থাকতে পারে। একটি পেজের পরিচালনাকারী মহিলা দাবি করেছেন যে তিনি তেহরান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিজিওলজিতে ডিগ্রি অর্জন করেছেন এবং মালয়েশিয়া থেকে আন্তর্জাতিক ম্যাসাজ থেরাপি ডিগ্রি পেয়েছেন। তার প্রোফাইলে লেখা রয়েছে যে তিনি তেহরানে মহিলা ও পুরুষ উভয়ের জন্য ম্যাসাজ পরিষেবা দেন। এসব পেজে বাড়িতে গিয়ে পরিষেবা দেওয়া, ফুট ম্যাসাজ, হট স্টোন ম্যাসাজ এবং থাই ম্যাসাজের মতো বিভিন্ন পরিষেবার কথা উল্লেখ থাকে। ছবিতে বা ভিডিওতে তরুণীদের ম্যাসাজ দিতে দেখা যায় এবং সম্ভাব্য গ্রাহকদের নিজেদের পছন্দমতো থেরাপিস্ট বেছে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়।

কিন্তু এই পেজগুলোর সঙ্গে যুক্ত টেলিগ্রাম চ্যানেলে গেলে পরিষেবার তালিকা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সেখানে ম্যাসাজের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের যৌন পরিষেবার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। মূল্য তালিকায় দেখা যায় ৯০ মিনিটের ম্যাসাজের জন্য প্রায় ২১ মিলিয়ন রিয়াল, ম্যাসাজসহ যৌন পরিষেবার জন্য প্রায় ৪৭ মিলিয়ন রিয়াল, সারারাতের জন্য প্রায় ৬২ মিলিয়ন রিয়াল এবং ২৪ ঘণ্টার জন্য প্রায় ১৩০ মিলিয়ন রিয়াল নেওয়া হয়। পরিষেবা বুক করার ক্ষেত্রে সাধারণত অগ্রিম অর্থ দিতে বলা হয় এবং অনেক সময় সেই অর্থ অন্য কারও নামে থাকা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা দিতে বলা হয়, যা পুরো ব্যবস্থাটিকে আরও সন্দেহজনক করে তোলে।

ইরানে পতিতাবৃত্তি সম্পূর্ণ বেআইনি এবং ধরা পড়লে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। অবিবাহিত নারী-পুরুষের যৌন সম্পর্ক, ব্যভিচার বা সমকামিতার জন্য কারাদণ্ড, বেত্রাঘাত এমনকি কিছু ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডের বিধানও রয়েছে। তবুও পর্যবেক্ষকদের মতে বাস্তবে এই ব্যবসা পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সংকট, বেকারত্ব, মাদকাসক্তি, শিক্ষার অভাব এবং সামাজিক অনিশ্চয়তা অনেক তরুণীকে চরম আর্থিক চাপে ফেলেছে। ফলে কেউ কেউ বাধ্য হয়ে বা শোষণের শিকার হয়ে এই ধরনের কাজে জড়িয়ে পড়ছেন বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

এই ধরনের অনেক পেজে তরুণীদের আলাদা প্রোফাইল তৈরি করে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়। একজন ২৪ বছর বয়সী মহিলা তার বিজ্ঞাপনে স্বাস্থ্য সার্টিফিকেট ও কোভিড টিকাকরণের প্রমাণ দেখিয়ে সম্ভাব্য গ্রাহকদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেছেন। তিনি প্রায় ২২৫ ডলার পারিশ্রমিকে ক্লায়েন্টদের সঙ্গে ভ্রমণে যাওয়ার প্রস্তাবও দিয়েছেন। অন্য এক মহিলা নিজের শারীরিক গঠন প্রদর্শন করে তোলা ছবি ও ভিডিও পোস্ট করেছেন সম্ভাব্য গ্রাহকদের আকর্ষণ করার জন্য। আবার কিছু প্রোফাইলে আন্তর্জাতিক ভ্রমণের জন্য প্রস্তুত থাকার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

অনেক পর্যবেক্ষকের মতে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রেও এক ধরনের অসঙ্গতি রয়েছে। মাঝে মাঝে বড় ধরনের অভিযান চালানো হলেও অনেক ক্ষেত্রে এই ধরনের নেটওয়ার্ক দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় থাকে। দুর্নীতি ও ঘুষের অভিযোগও প্রায়ই ওঠে। ফলে একদিকে রাষ্ট্র নৈতিকতার কঠোর নিয়ম প্রয়োগের দাবি করলেও অন্যদিকে সমাজের ভেতরে একটি গোপন অর্থনীতি গড়ে উঠছে, যা প্রকাশ্যে আলোচনার বাইরে রয়ে যায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল কঠোর আইন প্রয়োগ করেই এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও সামাজিক বৈষম্যের মতো মূল কারণগুলো মোকাবিলা না করলে এই ধরনের গোপন ব্যবসা পুরোপুরি নির্মূল করা কঠিন। একই সঙ্গে নারীদের জন্য কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ বাড়ানো এবং সামাজিক সচেতনতা তৈরির উদ্যোগও জরুরি বলে তারা মনে করেন। ইরানের বর্তমান বাস্তবতা অনেকের মতে দেখিয়ে দিচ্ছে যে কঠোর নৈতিক বিধিনিষেধ থাকা সত্ত্বেও সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটের চাপ মানুষের জীবনকে ভিন্ন বাস্তবতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।