আজকাল ওয়েবডেস্ক: দক্ষিণ কোরিয়ার সাম্প্রতিক ইতিহাসে সবচেয়ে নাটকীয় রাজনৈতিক সংকটের পর সাবেক প্রেসিডেন্ট Yoon Suk Yeol-কে আজীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করল আদালত। সামরিক আইন জারি করে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার চেষ্টার ঘটনায় তাঁকে “বিদ্রোহ”-এর অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে।

২০২৪ সালের ৩ ডিসেম্বর বিরোধী দল-নিয়ন্ত্রিত সংসদের অচলাবস্থা ভাঙার অজুহাতে হঠাৎ করেই সামরিক আইন জারি করেছিলেন ইউন। সেনা ও পুলিশকে মোতায়েন করে রাজধানী সিউলে সংসদ ভবন ঘিরে ফেলা হয়। অভিযোগ, তাঁর নির্দেশ ছিল বিরোধী নেতাদের গ্রেপ্তার করা এবং একটি “অনির্দিষ্ট” সময়ের জন্য কার্যত নির্বাহী ক্ষমতা এককভাবে নিজের হাতে তুলে নেওয়া।

কিন্তু পরিকল্পনাটি ছিল তড়িঘড়ি ও দুর্বল। সেনাবাহিনীর অবরোধ ভেঙে একদল সাংসদ সংসদে ঢুকে কোরাম পূর্ণ করেন এবং সর্বসম্মতভাবে সামরিক আইন প্রত্যাহারের প্রস্তাব পাশ করেন। মাত্র ছয় ঘণ্টার মাথায় সেই ডিক্রি প্রত্যাহার করতে বাধ্য হন ইউন।

সিউল সেন্ট্রাল কোর্টের বিচারপতি Jee Kui-youn রায়ে বলেন, “সামরিক ও পুলিশ বাহিনীকে বেআইনি উপায়ে ব্যবহার করে সংসদ দখল এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা—এটি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক কাঠামোর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ।” আদালতের মতে, ইউন একটি “উল্লেখযোগ্য সময়ের জন্য” অবারিত ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যেই এই পদক্ষেপ নিয়েছিলেন।

বিশেষ কৌঁসুলি তাঁর জন্য মৃত্যুদণ্ডের দাবি তুলেছিলেন। যুক্তি ছিল, এই পদক্ষেপ দেশের গণতন্ত্রকে সরাসরি বিপন্ন করেছে। তবে বিশ্লেষকদের অনেকেই আগেই মনে করেছিলেন, যেহেতু ঘটনায় কোনও প্রাণহানি ঘটেনি এবং পরিকল্পনাটি দ্রুত ভেস্তে যায়, তাই আজীবন কারাদণ্ডই সম্ভাব্য শাস্তি হতে পারে।

উল্লেখ্য, দক্ষিণ কোরিয়া ১৯৯৭ সালের পর আর কোনও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেনি। কার্যত সেখানে মৃত্যুদণ্ডে একটি অলিখিত স্থগিতাদেশ বলবৎ রয়েছে।

রায় ঘোষণার দিন আদালত চত্বরজুড়ে ছিল কড়া নিরাপত্তা। শতাধিক পুলিশ মোতায়েন ছিল। ইউনকে বহনকারী প্রিজন বাস আদালতে ঢোকার সময় তাঁর সমর্থকেরা স্লোগান তোলেন। অন্যদিকে সমালোচকেরা মৃত্যুদণ্ডের দাবিতে বিক্ষোভ দেখান। স্পষ্ট ছিল, দেশ এখনও গভীরভাবে বিভক্ত।

এই মামলায় প্রাক্তন প্রতিরক্ষামন্ত্রী Kim Yong Hyun-সহ একাধিক সামরিক ও পুলিশ কর্মকর্তাকেও দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। সামরিক আইন জারির পরিকল্পনা ও বাহিনী মোতায়েনের কেন্দ্রীয় ভূমিকায় থাকার জন্য কিমকে ৩০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী Han Duck-soo-কে ২৩ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত। অভিযোগ, তিনি মন্ত্রিসভার বৈঠক জোর করে ডেকে সামরিক আইনকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেন, নথি জাল করেন এবং শপথভঙ্গ করে মিথ্যা সাক্ষ্য দেন। হান ইতিমধ্যেই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছেন।

২০২৪ সালের ১৪ ডিসেম্বর সংসদে দোষী সাব্যস্ত হন ইউন। পরে ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে Constitutional Court of Korea তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে পদচ্যুত করে। গত জুলাই থেকে তিনি গ্রেপ্তার অবস্থায় ছিলেন এবং একাধিক ফৌজদারি মামলার মুখোমুখি হন। বিদ্রোহের অভিযোগটিই ছিল সবচেয়ে গুরুতর।

গত মাসেই তাঁকে আরও পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয় গ্রেপ্তারে বাধা দেওয়া, সামরিক আইন ঘোষণাপত্র জাল করা এবং পূর্ণ মন্ত্রিসভা বৈঠক এড়িয়ে যাওয়ার অভিযোগে।

কট্টর রক্ষণশীল রাজনীতিক ইউন নিজের সিদ্ধান্তকে “রাষ্ট্রবিরোধী শক্তি”র বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ বলে দাবি করে এসেছেন। তাঁর বক্তব্য, বিরোধী শিবির সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সরকারের কাজকর্ম স্তব্ধ করে দিচ্ছিল।

তবে আদালতের এই রায় দক্ষিণ কোরিয়ার গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলির দৃঢ়তা এবং সামরিক শাসনের স্মৃতিবহুল অতীত থেকে দেশের দূরত্বকেই নতুন করে সামনে আনল। ইউন ইতিমধ্যেই আপিলের ইঙ্গিত দিয়েছেন। ফলে আইনি লড়াই এখানেই শেষ হচ্ছে না।

দক্ষিণ কোরিয়ার রাজনীতিতে এই রায় এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল—যেখানে ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে বিচারব্যবস্থা কতটা কঠোর হতে পারে, তার এক নজির স্থাপিত হল।