আজকাল ওয়েবডেস্ক: বাংলাদেশ জামাতে ইসলামীর প্রধান ডা. শফিকুর রহমানের ভারত সম্পর্ক নিয়ে করা একটি মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। জামাত ক্ষমতায় এলে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক কেমন হবে? এক সাংবাদিকের এমন প্রশ্নের জবাবে জামাত প্রধান সবুজ, ঝলমলে আলোর দিকে ইঙ্গিত করে হাসতে হাসতে বলেন, "ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের কথা বলছেন? দেখতে পাচ্ছেন এটা কতটা রঙিন..."। এরপর তিনি সেখান থেকে চলে যান।

শফিকুর রহমানের এই মন্তব্যে ঘিরেই রহস্য দানা বেঁধেছে। সেদেশের কট্টরপন্থী এই দল যেন ক্রমশ উপলব্ধি করছে যে, ঢাকার পাকিস্তানপন্থী এবং ভারতবিরোধী অবস্থান বাংলাদেশের তেমন স্বার্থবাহী হয়নি।

জামাত ভারতের সঙ্গে ভাল সম্পর্ক গড়ে তুলতে আগ্রহী। শফিকুরের মন্তব্যে এই প্রথম যেন সেই ইঙ্গিত পাওয়া গেল। যদিও বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালী সরকার বারবার ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে ভারতে অবস্থানকে একটি ইস্যু হিসেবে তুলে ধরায় ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক তলানিতে এসে ঠেকেছে। অবশ্য, হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়ার জন্য জামাত ভারতকে একতরফাভাবে নিশানা করেছে। জামাতের বেশ কয়েকজন সমর্থক ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে লক্ষ্যবস্তু করার কথা বলেছেন।

কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে জামাতের শীর্ষ নেতৃত্ব তাঁদের বাগাড়ম্বর কিছুটা কমিয়েছেন। শফিকুর রহমান এর আগে দাবি করেছিলেন যে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে একজন ভারতীয় কূটনীতিক তাঁর সঙ্গে দেখা করেছিলেন।

আসন্ন ত্রয়োদশ সাধারণ নির্বাচনের ইশতেহারে বাংলাদেশ জামাতে ইসলামী ভারত, ভুটান, নেপাল, মায়ানমার, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ এবং থাইল্যান্ড-সহ প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে 'পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ন্যায্যতার' ভিত্তিতে শান্তিপূর্ণ ও সহযোগিতামূলক সম্পর্কের আহ্বান জানিয়েছে।

জামাত, পাকিস্তানপন্থী, কট্টরবাদী ইসলামী সংগঠন। অতীতে এই সংগঠন প্রবল ভারতবিরোধী অবস্থানের জন্য সুপরিচিত ছিল এবং এর বেশ কয়েকজন নেতা বা সহযোগী ভারতবিরোধী বিবৃতি দিয়েছেন। তবে জামাত সাম্প্রতিক সময়ে হিন্দুদের প্রতি কিছু পদক্ষেপের মাধ্যমে নিজেদের ভাবমূর্তি পরিবর্তনের চেষ্টা করেছে। এমনকী এই সংগঠন একটি হিন্দু-অধ্যুষিত আসনে একজন হিন্দু প্রার্থীও দিয়েছে। ভারত বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর নির্যাতনের বিষয়টি বারবার তুলে ধরেছে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিদেশ বিষয়ক উপদেষ্টা মহম্মদ তৌহিদ হোসেন স্বীকার করেছেন যে, বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক 'খুব মসৃণ' ছিল না এবং মহম্মদ ইউনূসের আমলে কিছু বাধার সম্মুখীন হয়ে তা কিছুটা স্থবির হয়ে পড়েছে। তবে তিনি আশাবাদী। তাঁর কথায়, পরবর্তী নির্বাচিত সরকার সব সমস্যা মোকাবিলা করতে এবং সম্পর্ককে মসৃণ করতে সক্ষম হবে।

বৃহস্পতিবার বাংলাদেশের বিদেশ বিষয়ক উপদেষ্টা মহম্মদ তৌহিদ সাংবাদিকদের বলেন, "আমি কাউকে দোষারোপ করতে চাই না। ভারত অবশ্যই তার স্বার্থের জন্য যা সর্বোত্তম বলে মনে করেছে, সেভাবেই কাজ করেছে। আমরাও এমনভাবে কাজ করার চেষ্টা করেছি যা আমাদের স্বার্থ রক্ষা করে। অনেক ক্ষেত্রে দুই পক্ষের প্রত্যাশা মেলেনি।"

হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরৎ পাঠানোর দাবি ঘিরেই দুই প্রতিবেশীর মধ্যে সম্পর্ক কঠিন হয়েছে বলে মনে করেন মহম্মদ তৌহিদ। বিদেশ বিষয়ক উপদেষ্টা বলেন, "আনুষ্ঠানিকভাবে যা করা হয়েছে, তা-ই বলা যায়। আমরা তাঁকে (শেখ হাসিনা) ফেরৎ চেয়েছি। আমরা কোনও উত্তর পাইনি। এর বাইরে আমাদের অনুমান করা ঠিক হবে না।"

হাসিনা সরকারের পতনের পর এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মহম্মদ ইউনূসের চীনে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল নিয়ে মন্তব্যের পর থেকে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হয়েছে। হিন্দুদের ওপর হামলাও ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে অবনতির দিকে নিয়ে যাওয়া অন্যান্য সমস্যার তালিকায় যুক্ত হয়েছে।

এই নির্বাচনে জামাতের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীও ভারতের সঙ্গে বাস্তবসম্মত সম্পর্ক চেয়েছে।

১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর বাংলাদেশে একটি নির্বাচিত সরকার ফিরে এলে ভারত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে নতুন সূচনা চাইছে। প্রক্তন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শেষকৃত্যের সময় ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ঢাকায় বিএনপি চেয়ারপারসন তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করেন। রহমানের সঙ্গে বৈঠকে জয়শঙ্কর গণতন্ত্রে জিয়ার অবদানের কথা স্বীকার করেন এবং আসন্ন নির্বাচনের পর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হবে বলে তিনি আশাবাদী।