আজকাল ওয়েবডেস্ক: সাপের কামড় এখনও বহু অঞ্চলে বিরাট সংকট। চিকিৎসা না পেলে এর ফলে অঙ্গচ্ছেদ, স্থায়ী প্রতিবন্ধকতা এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে। প্রচলিত অ্যান্টিভেনম থাকলেও, সেগুলি এখনও শতাধিক বছরের পুরনো প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল—যেখানে প্রাণীর শরীরে বিষ ইনজেকশন দিয়ে অ্যান্টিবডি সংগ্রহ করা হয়। এই পদ্ধতি ব্যয়বহুল, সীমিত কার্যক্ষম এবং রোগীর শরীরে নানা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে।
এমন পরিস্থিতির মধ্যে, নিরাপদ, বিস্তৃত কার্যক্ষমতা সম্পন্ন এবং কম খরচে উৎপাদনযোগ্য অ্যান্টিভেনম তৈরির জন্য বিশ্বজুড়ে গবেষণা চলছে। পেগস ইউরোপ ২০২৫ সম্মেলনে, টেকনোলজি নেটওয়ার্কস কথা বলেছে ডেনমার্কের টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটির বায়োলজিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রধান ও অধ্যাপক ড. আন্দ্রেয়াস লাউস্টসেন-কিয়েলের সঙ্গে। তিনি বলেন, সাপের কামড়ের বর্তমান চিকিৎসা পদ্ধতিতে বহু সীমাবদ্ধতা রয়েছে এবং নতুন প্রজন্মের অ্যান্টিভেনম এই অচলাবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার পথ দেখাচ্ছে।
ড. লাউস্টসেন-কিয়েলের মতে, অন্যান্য রোগের ক্ষেত্রে যেমন নিরবচ্ছিন্ন উদ্ভাবন হয়েছে, সাপের কামড়ের চিকিৎসায় তা হয়নি। প্রচলিত অ্যান্টিভেনম প্রাণী নির্ভর, বিশেষত ঘোড়ার অ্যান্টিবডি থেকে তৈরি, যা মানবদেহে প্রবেশ করানো হয়। ফলে অ্যান্টিবডির অমিল ও প্রতিক্রিয়ার কারণে রোগীর শরীরে তীব্র পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।
আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হল প্রতি সাপের বিষ আলাদা। পৃথিবীতে ৬০০-র বেশি বিষধর সাপ আছে এবং প্রত্যেকে নিজস্ব টক্সিনের সংমিশ্রণ উৎপন্ন করে। তাই একটি অ্যান্টিভেনম সব সাপের কামড়ে কাজ করে না।
এছাড়া উৎপাদন ব্যয় বেশি এবং মাত্র ১০-৩০% অ্যান্টিবডিই বিষ-নিরপেক্ষকরণে কাজে লাগে। বাকি সব অ্যান্টিবডি অপ্রয়োজনীয়, কিন্তু উৎপাদন ও বিশুদ্ধকরণে খরচ বাড়ায়। এসব কারণে বহু নির্মাতা অ্যান্টিভেনম উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে এবং দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। ফলে আফ্রিকা, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার গ্রামীণ মানুষ চিকিৎসার বাইরে থেকে যায়—যেখানে স্বাস্থ্যসেবা ও অ্যান্টিভেনম দুটোই অপ্রতুল।
২০১৭ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা একটি গ্রুপ গঠন করে সচেতনতা বৃদ্ধি ও মৃত্যুহার কমানোর রোডম্যাপ তৈরির জন্য। পাশাপাশি বিভিন্ন গবেষণা দল নতুন, নিরাপদ ও সুলভ অ্যান্টিভেনম তৈরিতে অগ্রগতি অর্জন করেছে। যদিও এখনও সব সাপের কামড়ের জন্য সার্বজনীন অ্যান্টিভেনম হয়নি, তবে বিস্তৃত কার্যক্ষমতার দিকে বড় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি ড. লাউস্টসেন-কিয়েল ও তাঁর সহকর্মীরা আফ্রিকার সবচেয়ে মারাত্মক এলাপিড সাপ—বিশেষ করে কোবরা ও মাম্বার—বিষের সাতটি প্রধান টক্সিন সাবফ্যামিলি নিষ্ক্রিয় করতে সক্ষম রিকম্বিন্যান্ট অ্যান্টিভেনমের প্রিক্লিনিক্যাল ফলাফল প্রকাশ করেছেন। তাঁদের পদ্ধতিতে ১৮টি আফ্রিকান সাপের বিষ মিশিয়ে লামা ও আলপাকাকে ইমিউনাইজ করা হয়। এরপর ওই প্রাণীদের উৎপাদিত ন্যানোবডির ডিএনএ সিকোয়েন্স সংগ্রহ করে ই. কোলাই ব্যাকটেরিয়ায় প্রবেশ করানো হয়, যাতে বিশাল পরিমাণে ইন ভিট্রো উৎপাদন সম্ভব হয়।
এই অগ্রগতি ইঙ্গিত দিচ্ছে, ভবিষ্যতে আমরা প্রাণী নির্ভর অ্যান্টিভেনম থেকে বেরিয়ে সাশ্রয়ী, নিরাপদ ও স্কেলযোগ্য সমাধানের দিকে এগোতে পারব—যা লাখো মানুষের প্রাণ বাঁচাতে পারে।
