আজকাল ওয়েবডেস্ক: চব্বিশের আগস্টে শেখ হাসিনার পদচ্যূতির পর রাষ্ট্রপতিকেই কোণঠাসা করার চেষ্টা করেছিলেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মহম্মদ ইউনূস। দিন কয়েক আগেই বিস্ফোরক এই দাবি করেছিলেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মহম্মদ শাহাবুদ্দিন। এবার ইউনূসের বিরুদ্ধে তোপ দাগায় রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধেই মুখ খুললেন সেদেশের ইসলামপন্থী দল বাংলাদেশ জামায়াত-ই-ইসলামির আমির শফিকুর রহমান! ফলে স্পষ্ট হল ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সঙ্গে জামায়াত-ই-ইসলামির আঁতাত।

জামায়াত প্রধান শফিকুর রহমান রাষ্ট্রপতি শাহাবুদ্দিনের সমালোচনা করেছেন:
সাক্ষাৎকারের সময় শাহাবুদ্দিন,ত ইউনূস এবং তাঁর শাসনব্যবস্থার সমালোচনা করেছিলেন। তারই পাল্টা মুখ খুলেছেন জামায়াত সুপ্রিমো।

মঙ্গলবার ফেসবুকে বাংলাদেশের বিরোধী দলের নেতা শফিকুর রহমান লিখেছেন, '২০২৪ সালের ৫ই অগাস্ট বিষয়ে রাষ্ট্রপতি অনেক কিছুই চেপে গিয়েছেন। পদচ্যূত পলাতক প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের বিষয়ে উনি উপস্থিত নেতৃবৃন্দকে যা বলেছিলেন এবং পরবর্তীতে জাতিকে যা জানিয়েছিলেন তা তিনি তাঁর বর্তমান বক্তব্যে স্বীকার করেননি। আর এখন যা বলছেন সেদিন তার কিছুই তিনি বলেননি।'

আমির শফিকুর রহমান আরও লেখেন, 'কোটি-কোটি মানুষ যা শুনলো এবং সেদিন তিনি যা বললেন আর এখন যা বলছেন তার হিসেব রাষ্ট্রপতি মিলিয়ে দেবেন কি? জাতি অবুঝ নয়। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ জায়গা থেকে এ রকম আচরণ মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়।' 

শফিকুর, শেখ হাসিনার হারিয়ে যাওয়া পদত্যাগপত্র নিয়ে বিতর্কের কথা উল্লেখ করেন। যা সাংবিধানিকভাবে হাসিনার ভারত সফরের পর নির্ধারিত ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন শাসনব্যবস্থাকে বৈধতা দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রয়োজন ছিল। তিনি লেখেন, 'আপনি জানেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাষ্ট্রপতির কাছে তাঁর পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন এবং আমি তা পেয়েছি। শাহাবুদ্দিন ৫ আগস্ট, হাসিনা চলে যাওয়ার কয়েক ঘন্টা পরে জাতির উদ্দেশ্যে টেলিভিশনে সম্প্রচারিত ভাষণে বলেছিলেন।'

দুই মাস পর, ২০২৪ সালের অক্টোবরে ঢাকা-ভিত্তিক সংবাদপত্র, 'জনতার চোখ'কে শাহাবুদ্দিন বলেছিলেন- রাষ্ট্রপতি তিনি কেবল হাসিনার পদত্যাগের কথা শুনেছেন, কিন্তু হাসিনার পদত্যাগের কোনও প্রমাণ তাঁর কাছে নেই। আমি অনেকবার [পদত্যাগপত্র সংগ্রহ করার] চেষ্টা করেছি কিন্তু ব্যর্থ হয়েছি। হয়তো তাঁর কাছে সময় ছিল না।" 

উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হওয়া শাহাবুদ্দিন হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের একজন নিযুক্ত সদস্য ছিলেন।

হাসিনা জমানার পর শাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের ফলে তাঁর অপসারণের দাবিতে বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল। তবে শেষপর্যন্ত রাষ্ট্রপতি পদে শাহাবুদ্দিনই বহাল ছিলেন। ইউনূসের শাসনকালের ১৮ মাস শাহাবুদ্দিনই ছিলেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি। তিনি অভিযোগ করেন যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাঁকে বারবার শীর্ষ পদ থেকে অপসারণের চেষ্টা করেছিল।

যাইহোক, তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জয়লাভ করে।সেষ হয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শাসনকাল। এরপর মুখ খোলেন রাষ্ট্রপতি। ইউনিসের আমলে তাঁকে কী কী প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে পড়তে হয়েছিল তা নিয়ে নিশানা করেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টাকে। 

ইউনূস শাসন সম্পর্কে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি শাহাবুদ্দিন যা বলেছেন...
বাংলাদেশ ও আমেরিকার মধ্যে "গোপন" বাণিজ্য চুক্তির উদাহরণ দিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেছিলেন, ইউনূস সরকার তাঁর ক্ষমতার শেষ দিনগুলিতে তাড়াহুড়ো করে গোপনে চুক্তিন স্বাক্ষর করেছিল। শাহাবুদ্দিন বলেন, "এই ধরনের রাষ্ট্রীয় চুক্তি আমাকে জানানো উচিত ছিল।" শাহাবুদ্দিন বলেছিলেন, ছোট হোক বা বড়, অবশ্যই পূর্ববর্তী সরকার প্রধানরা রাষ্ট্রপতিকে অবহিত করেছিলেন। এবং এটা একটা সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা। কিন্তু তিনি [ইউনূস] তা করেননি।" 

রাষ্ট্রপতির মতে, তিনি কেবল বিএনপির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনীর কাছ থেকে প্রাপ্ত সমর্থনের কারণেই কুর্সি ধরে রাখতে পেরেছিলেন। শাহাবুদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, "বিএনপির একজন উচ্চপদস্থ নেতা আমাকে আশ্বস্ত করেছেন যে- আমার তাদের সমর্থন রয়েছে। আমরা সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে চাই। আমরা কোনও অসাংবিধানিক উপায়ে রাষ্ট্রপতিকে অপসারণের পক্ষে নই।" 

রাষ্ট্রপতি শাহাবুদ্দিন আরও উল্লেখ করেন যে, কীভাবে ইউনূসের শাসনকালে তাঁকে কার্যত গৃহবন্দী করে রাখা হয়েছিল, যার ফলে তিনি চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে পারেননি। শাহাবুদ্দিন অভিযোগ করেন, "সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি হাসপাতালে আমার বাইপাস সার্জারি হয়েছিল। অস্ত্রোপচারের এক বছর পর, সেখানকার হাসপাতালে আমার পরবর্তী অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল। আমি চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর যাওয়ার জন্য বিদেশ মন্ত্রককে চিঠি লিখেছিলাম। জবাবে, আমাকে সরাসরি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।"  

শাহাবুদ্দিন আরও বলেন যে তাকে দু'বার ঈদের নামাজে অংশগ্রহণের জন্য জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে যেতেও দেওয়া হয়নি।

কিন্তু, শাহাবুদ্দিন বিস্ফোরক দাবি করার কয়েকদিন পর, ইউনূস বা তাঁর সহযোগীরা নয়, বরং জামায়াতের শফিকুর রহমান রাষ্ট্রপতি শাহাবুদ্দিনকে আক্রমণের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন। 

শফিকুরের সমালোচনা কী ইসলামপন্থী দলের সঙ্গে-ইউনূসের আঁতাত 

মহম্মদ ইউনূস এবং তাঁর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র নিন্দা করেছেন শাহাবুদ্দিন, তবে বাদ রাখেননি জামায়াতের আমিরকেও। রাষ্ট্রপতির উপর আক্রমণ করায় শফিকুর রহমানকেও নিশানা করেন রাষ্ট্রপতি। যদিও জামায়াত-ই-ইসলামির কথা উল্লেখ করা হয়নি। প্রশ্ন হল কেন?

রাষ্ট্রপতির দাবির প্রতি আমিরের প্রতিক্রিয়া তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ অভিযোগ করা হয়েছিল যে- জামায়াত এবং তার ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবিরের মতো ইসলামপন্থী দলগুলো আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের নেপথ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইসলামপন্থী এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মধ্যে শুরু থেকেই পারস্পরিকভাবে লাভজনক সম্পর্ক ছিল।

বাংলাদেশে কোটা বিরোধী আন্দোলন ইসলামপন্থী দলগুলো ছিনতাইয়ের পর শান্তিপূর্ণ আন্দোলন থেকে হিংসাত্মক আন্দোলনে রূপান্তরিত হয়েছিল। কিন্তু, হাসিনা বিরোধী আন্দোলনের অগ্রভাগে থাকা অনেক ছাত্র নেতা, যেমন নাহিদ ইসলাম, ২০২৬ সালের নির্বাচনে জামায়াতের সঙ্গে জোট বেঁধেছিলেন। এই ছাত্র নেতাদের অনেকেই ইউনূস মন্ত্রিসভায় গুরুত্বপূর্ণ পদও পেয়েছিলেন।

২০২৪ সালের আগস্টে দায়িত্ব গ্রহণের কয়েকদিন পর, ইউনূস ইসলামপন্থী দল হেফাজতে ইসলামের নেতা মামুনুল হকের সঙ্গে দেখা করেন। এর বিনিময়ে, ইউনূস বাংলাদেশকে একটি ইসলামী প্রজাতন্ত্রের দিকে নিয়ে যাওয়ার পথে সাহায্য করেছিলেন। ইউনূসের শাসনামলে গৃহীত বেশ কয়েকটি পদক্ষেপ বাংলাদেশে ইসলামী শক্তির পুনরুজ্জীবনকে সক্ষম করে। হাসিনার বিদায়ের কয়েকদিন পর, প্রশাসন জামায়াতের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে, যা আওয়ামী লীগ সরকার নিষিদ্ধ করেছিল। ইউনূস প্রশাসন বেশ কয়েকজন কারাবন্দী ইসলামপন্থী নেতাকে মুক্তি দেয়, যার মধ্যে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সুপ্রিমো দণ্ডিত জঙ্গি মাস্টারমাইন্ড জসিমুদ্দিন রহমানিও অন্তর্ভুক্ত ছিল। সরকার ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধী এটিএম আজহারুল ইসলামকেও মুক্তি দেয়। পরে, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আজহারুল ইসলাম রংপুর-২ আসন থেকে জয়ী হন।

একই সময়ে বাংলাদেশ সামরিক ও কূটনৈতিকভাবে পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকে পড়ে। 

জামায়াতের সঙ্গে জোটের ফলে নির্বাচনের আগে এনসিপির অনেক ছাত্রনেতা পদত্যাগ করেন। এনসিপির বেশ কয়েকজন মহিলা নেত্রী দল ত্যাগ করেন এবং কেউ কেউ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করার সিদ্ধান্ত নেন।

যদিও ইউনূস বা বাংলাদেশে সক্রিয় ইসলামপন্থী দলগুলি কেউই তাদের মধ্যে যোগসূত্রের কথা প্রকাশ্যে স্বীকার করেনি। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে উভয়ই একে অপরের কর্মকাণ্ড থেকে স্পষ্টতই উপকৃত হয়েছে। তাই শাহাবুদ্দিনের সমালোচনা সাংবিধানিক নৈতিকতা রক্ষার বিষয়ে কম, বরং উভয় পক্ষের জন্য উপকারী রাজনৈতিক ব্যবস্থা রক্ষার বিষয়ে বেশি।