আজকাল ওয়েবডেস্ক: অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রাক্তন মুখ্য উপদেষ্টা মহম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে সরব বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মহম্মদ শাহাবুদ্দিন। অভিযোগ, ক্ষমতায় থাকাকালীন ইউনূস রাষ্ট্রপতির চেয়ারকে এড়িয়ে নানা কাজ করেছিলেন, খাটো করার চেষ্টা করেছিলেন রাষ্ট্রপতি পদের মর্যাদা। যা আদতে সাংবিধানিক নিয়ম লঙ্ঘন। সেদেশের বাংলা দৈনিক 'কালের কণ্ঠ'-এ প্রকাশিত একটি সাক্ষাৎকারে এমনই বলেছেন রাষ্ট্রপতি মহম্মদ শাহাবুদ্দিন।

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি অভিযোগ করেছেন যে, ইউনূস প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় বজায় রাখেননি বা বিদেশ সফর, চুক্তি এবং নীতিগত পদক্ষেপ-সহ গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত সম্পর্কে তাঁকে অবহিত করেননি। তিনি দাবি করেছেন যে, অন্তর্বর্তীকালী সরকারের সময়ে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে তাঁকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য বারবার চেষ্টা করা হয়েছিল।

সাক্ষাৎকারে, রাষ্ট্রপতি শাহাবুদ্দিন অভিযোগ করেছেন যে- মহম্মদ ইউনূস রাষ্ট্রপতির সঙ্গে নিয়মিত পরামর্শের জন্য প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক বিধানগুলি অনুসরণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। রাষ্ট্রপতি বলেছেন, "সংবিধানে বলা হয়েছে যে যখনই তিনি বিদেশ সফরে যান, তখন তাঁকে ফিরে আসার পরে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করতে হবে এবং আলোচনা এবং ফলাফল সম্পর্কে আমাকে লিখিতভাবে অবহিত করতে হবে। তিনি (মহম্মদ ইউনূস) ১৪ থেকে ১৫বার বিদেশ ভ্রমণ করেছিলেন কিন্তু একবারও আমাকে অবহিত করেননি।"  

রাষ্ট্রপতি আরও দাবি করেছেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত গোপন বাণিজ্য চুক্তি-সহ গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় বিষয়গুলি সম্পর্কে তাঁকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রাখা হয়েছিল। শাহাবুদ্দিন সংবাদপত্র'কে বলেছেন, "আমি এ সম্পর্কে কিছুই জানতাম না। এই ধরনের রাষ্ট্রীয় চুক্তি রাষ্ট্রপতির কাছে জানানো উচিত। এটা একটা সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা। কিন্তু তিনি আমাকে মৌখিকভাবে বা লিখিতভাবে অবহিত করেননি।"

ইচ্ছাকৃতভাবে রাষ্ট্রপতি পদকে এড়িয়ে য়াওয়া বা খাটো করার অভিযোগ তুলেছেন  শাহাবুদ্দিন। তাঁর দাবি, রাষ্ট্রপতি অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসন গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করার পরেও ইউনূস তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ এড়িয়ে যান। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি বলেন, “আমিই ছিলাম সেই প্রক্রিয়ার উৎস যার মাধ্যমে তিনি প্রধান উপদেষ্টা হয়েছিলেন, তবুও তিনি কখনও আমার সঙ্গে সমন্বয় করেননি। তিনি একবারও আমার সঙ্গে দেখা করতে আসেননি এবং আমাকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রাখার চেষ্টা করেছিলেন।” 

রাষ্ট্রপতি আরও অভিযোগ করেছেন যে, পরামর্শ ছাড়াই তাঁর বৈদেশিক কর্মকাণ্ড বন্ধ করে দিয়েছিল অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। কসোভো এবং কাতার থেকে আমন্ত্রণপত্র পাঠানোর কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, কর্মকর্তারা তাঁর নামে সফর বাতিলের জন্য চিঠি তৈরি করেছিলেন। রাষ্ট্রপতি শাহাবুদ্দিনের কথায়, "একটি চিঠি তৈরি করা হয়েছিল, যেখানে বলা হয়েছিল যে- আমি রাষ্ট্রীয় কাজে অত্যন্ত ব্যস্ত ছিলাম এবং তাই বিদেশ সফরে উপস্থিত থাকতে পারছিলাম না। এটা প্রস্তুত করার আগে আমার সঙ্গে কোনও আলোচনা করা হয়নি।” তিনি ব্যঙ্গাত্মকভাবে বলেন, “আমাদের সংবিধানের অধীনে কি একজন রাষ্ট্রপতি এত ব্যস্ত থাকেন?"

শাহাবুদ্দিন আরও দাবি করেন যে, দেশে এবং বিদেশে তাঁর উপস্থিতি মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতি বলেছেন, “তাঁরা চায়নি যে আমার নাম কোথাও প্রকাশিত হোক। তারা আমাকে অন্ধকারে রাখার চেষ্টা করেছিল যাতে মানুষ আমাকে চিনতে না পারে।” শাহাবুদ্দিন অভিযোগ করেন যে, তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয় সমাবর্তন এবং রাষ্ট্রপ্রধানের সভাপতিত্বে ঐতিহ্যগতভাবে অনুষ্ঠিত অন্যান্য জাতীয় অনুষ্ঠানেও যোগ দিতে বাধা দেওয়া হয়েছিল। বিদেশ সফরের সময় একজন উপদেষ্টার আপত্তি জানানোর পর বিদেশের বাংলাদেশি মিশনগুলি থেকে তাঁর সরকারি ছবি রাতারাতি সরিয়ে ফেলা হয়েছিল। রাষ্ট্রতির দাবি, "বিশ্বজুড়ে, দূতাবাস এবং হাইকমিশন রাষ্ট্রপতির ছবি প্রদর্শন করে কারণ রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করেন।"

বিষয়টিকে সম্ভবত তাঁকে রাষ্ট্রপতি পদ থেকে অপসারণের প্রথম পদক্ষেপ বলে মনে করেন মহম্মদ শাহাবুদ্দিন।

ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির নবনির্বাচিত সদস্যদের সঙ্গে নিয়মিত সৌজন্য সাক্ষাতের খবর সংবাদপত্রে প্রকাশিত হওয়ার পর, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বঙ্গভবনের প্রেস কার্যক্রম ভেঙে দেওয়ারও অভিযোগ করেছেন রাষ্ট্রপতি।  তিনি বলেন, “তাঁরা তিনজন কর্মকর্তা, প্রেস সচিব, উপ-প্রেস সচিব এবং সহকারী প্রেস সচিবকে জোর করে অপসারণ করে। এমনকী ৩০ বছর ধরে এখানে কাজ করা আলোকচিত্রীদেরও বাতিল করা হয়।"

শাহাবুদ্দিন দাবি করেছেন যে তাঁকে রাষ্ট্রপতি পদ থেকে অপসারণের জন্য বারবার রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক চাপ প্রয়োগ করা হয়েছিল, কিন্তু সেই প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়। রাষ্ট্রপতির কথায়, “একজন উপদেষ্টা বিচারকের কাছে গিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি তা প্রত্যাখ্যান করে বলেন, সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রপতি উপরে আছেন এবং তিনি অবৈধভাবে এই পদ গ্রহণ করতে পারেন না।"  অর্থাৎ মহম্মদ ইউনূস যে বাংলাদেশের প্রদানের কুর্সিতে বসতে চেয়েছিলেন তা স্পষ্ট।

শাহাবুদ্দিন, বিরোধী বিএনপি নেতাদের এবং সশস্ত্র বাহিনীকে রাজনৈতিকভাবে অস্থির সময়কালে তাঁকে সমর্থন করার জন্য কৃতিত্ব দেন। বলেন, “তাঁরা আমাকে আশ্বস্ত করেছিল যে, তাঁরা অসাংবিধানিক উপায়ে রাষ্ট্রপতিকে অপসারণের পক্ষে নন।” তিনি বলেন, সামরিক নেতৃত্ব তাঁকে বলেছেন, “আপনার পরাজয় মানে সশস্ত্র বাহিনীর পরাজয়।” উত্তেজনা সত্ত্বেও, শাহাবুদ্দিন বলেছেন যে- তিনি সাংবিধানিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য পদে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাঁর কথায়, "আমি কেবল সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্য দৃঢ়তার সঙ্গে সবকিছু সহ্য করেছি।"