আজকাল ওয়েবডেস্ক: বাংলাদেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে এক বিরাট পরিবর্তনের ঠিক এক বছর হয়ে গেল। ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হঠাৎ করে দেশ ছেড়ে চলে যান এবং ড. মহম্মদ ইউনূসকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে নিযুক্ত করা হয়।

তখন থেকেই বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা অব্যাহত। কিন্তু, সেদিন সকালে আসলে কী ঘটেছিল? সবই কি বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের অংশ? অজ্ঞাত স্থান থেকে নিউজ১৮-এর সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় হাসিনার মন্ত্রিসভার প্রাক্তন প্রতিমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী চমকপ্রদ দাবি করেছেন।

৫ অগাস্টের জন্য হাসিনার পরিকল্পনা কী ছিল?
আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ এবং সরকারি মহলের ঘনিষ্ঠ সূত্র নিউজ১৮-কে জানিয়েছে যে, সেদিন হাসিনার পরিকল্পনা একেবারেই ভিন্ন ছিল। ক্রমশ অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করার জন্য তাঁর বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করার কথা ছিল বলে জানা গিয়েছে। সবকিছু প্রস্তুতই ছিল, রাষ্ট্রপতির কার্যালয়কে অবহিতও করা হয়েছিল। তবে, হাসিনা আর বঙ্গভবনে আসেননি।

৪ অগাস্ট রাতে শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে একটি রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রের মতে, জরুরি অবস্থা জারির পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছিল, এমনকি সবুজ সংকেতও দেওয়া হয়েছিল। এই পদক্ষেপের উদ্দেশ্য ছিল সরকারকে সরকারি চাকরিতে বিতর্কিত কোটা ব্যবস্থা পুনর্বহালের প্রতিবাদে ছাত্র-নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহের পর হিংসা বিক্ষোভের বিরুদ্ধে দৃঢ় পদক্ষেপ করার সুযোগ করে দেওয়া।

‘অস্থিরতা তৈরি করা হয়েছিল’: চৌধুরী যা বলেছেন
হাসিনার মন্ত্রিসভার প্রাক্তন প্রতিমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী বলেছেন, "এটি ছিল একটি অভ্যন্তরীণ প্রাতিষ্ঠানিক ষড়যন্ত্র, যার নেরপথ্যে ছিল বহিরাগত শক্তির সমর্থন। জরুরি অবস্থা জারির পরিকল্পনা ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যর্থ হয়েছিল। সেনাপ্রধান প্রচণ্ড চাপের মুখে পড়েছিলেন এবং প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ মেনে কাজ করতে পারেননি। প্রকৃতপক্ষে, তিনি তাকে জানিয়ে দিয়েছিলেন যে কিছুই করা যাবে না। অন্য কোনও বিকল্প না থাকায় তাঁকে দেশ ছেড়ে চলে যেতে হয়েছিল।"

তিনি আরও যোগ করেন যে, সেইদিন সকালে যখন তিনি প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনের উদ্দেশ্যে তাঁর বাসভবন থেকে বের হন, তখন রাস্তাগুলি ভয়ঙ্করভাবে শান্ত ছিল - কোনও জনতাকে দেখা যাচ্ছিল না। হাসিনার মন্ত্রীর দাবি, "অস্থিরতা তৈরি করা হয়েছিল।"

৪ অগাস্ট কেন হাসিনাকে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করতে কেন বাধা দেওয়া হয়েছিল?
৪ আগস্ট রাত ১০টা নাগাদ হাসিনার রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করার কথা ছিল। রাজনৈতিক মহলে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল: কেন তাঁকে বাধা দেওয়া হয়েছিল?

আওয়ামী লীগের একাংশ মনে করে সেটি ছিল নাশকতা। সূত্র মতে, ঢাকায় দলীয় কর্মীদের জড়ো হতে বাধা দেওয়ার জন্য নির্দেশ জারি করা হয়েছিল। ক্রমবর্ধমান বিক্ষোভ মোকাবেলায় কোনও বাহিনী মোতায়েন করা হয়নি। মজার বিষয় হল, ৩ বা ৪ অগাস্ট কোনও বড় হতাহতের ঘটনা ঘটেনি, যা এই বিশ্বাসকে আরও জোরদার করে যে সময়মতো জরুরি অবস্থা ঘোষণা করলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যেত।

আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ সূত্রে খবর, "জরুরি কাঠামোর অধীনে লকডাউন আরোপ এবং পরে সর্বদলীয় সরকার গঠনের বিষয়েও আলোচনা হয়েছিল।" 

আওয়ামী লীগের কিছু নেতা যুক্তি দেন যে, যদি তাঁদের সমর্থকদের ৫ অগাস্ট রাস্তায় নামতে দেওয়া হত, তাহলে ফলাফল ভিন্ন হতে পারত। একজন শীর্ষ নেতা নিউজ১৮-কে বলেন, "এটা সম্পূর্ণ ওদের ষড়যন্ত্র ছিল, যারা হাসিনাকে সরাতে চেয়েছিল। জরুরি অবস্থা জারি করা হলে পরিস্থিতি স্থিতিশীল হয়ে যেত। কিন্তু ১ অগাস্ট থেকে, রাজনৈতিকভাবে এই পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে আমাদেরকে পদ্ধতিগতভাবে বাধা দেওয়া হয়েছিল। যা ছিল ১০০ শতাংশ নাশকতা।"

সূত্র জানায়, হাসিনা বাংলাদেশে তাঁর শেষ রাতটি সশস্ত্র বাহিনীর প্রধানদের সঙ্গে বৈঠক করে কাটিয়েছেন। খবরে বলা হয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে তিনি আশ্বাস পেয়েছিলেন। কিন্তু পরের দিন সকাল নাগাদ সবকিছু বদলে যায়।

গণ-বিক্ষোভ এবং সামরিক বাহিনী উভয়ের ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে শেষপর্যন্ত শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছাড়েন এবং হেলিকপ্টারে করে বাংলাদেশ ত্যাগ করেন। সরকারি চাকরিতে কোটা পুনর্বহালের সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তের ফলে বিক্ষোভের সূত্রপাত নাটকীয়ভাবে বেড়ে যায়, এর নেতৃত্ব দেন শিক্ষার্থীরা। সরকারের কঠোর ব্যবস্থা পরিস্থিতিকে আরও তীব্র করে তোলে।

বাংলাদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার চলছে। নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আগামী বছর পড়শি দেশটিতে নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। তবে এখনও পর্যন্ত যা অবস্থা- সেই ভোটে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণের সম্ভাবনা কম। 

কিন্তু, ৫ অগাস্ট আওয়ামী লীগের জন্য একটি অন্ধকার এবং বেদনাদায়ক স্মৃতি হিসেবেই রয়ে গিয়েছে।