আজকাল ওয়েবডেস্ক: অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের অন্যতম প্রাণঘাতী ক্যানসার হিসেবে ধরা হয়। দীর্ঘদিন ধরে এই রোগের চিকিৎসায় মূল ভরসা ছিল কেমোথেরাপি। তবে এবার আন্তর্জাতিক গবেষণায় উঠে এসেছে আশার খবর। বিজ্ঞানীদের দাবি, ডারাক্সনরাসিব নামে একটি নতুন ওষুধ উন্নত পর্যায়ের অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে কেমোথেরাপির তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।
গত এক দশকে জিনগত ত্রুটিকে লক্ষ্য করে তৈরি বিভিন্ন ‘প্রিসিশন মেডিসিন’ বা লক্ষ্যভিত্তিক ওষুধ অনেক ধরনের ক্যানসারের চিকিৎসায় সাফল্য দেখিয়েছে। কিন্তু অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারের ক্ষেত্রে সেই সাফল্য এতদিন অধরাই ছিল। কারণ, এই ক্যানসারের বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই জিনের ত্রুটিপূর্ণ প্রোটিনকে লক্ষ্য করে কার্যকর ওষুধ তৈরি করা অত্যন্ত কঠিন ছিল। বিজ্ঞানীরা বহু বছর ধরে এই প্রোটিনকে ‘আনড্রাগেবল’ বলেই মনে করতেন।
সম্প্রতি প্রকাশিত একটি আন্তর্জাতিক ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে সেই ধারণা বদলাতে শুরু করেছে। গবেষণার নেতৃত্বে থাকা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অধ্যাপক জিভ ইউনবার্গ জানান, অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারের চিকিৎসায় এতদিন কেবল ছোট ছোট অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে। কিন্তু নতুন এই ওষুধ চিকিৎসায় বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
গবেষণায় প্রায় ৫০০ জন উন্নত পর্যায়ের অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারে আক্রান্ত রোগী অংশ নেন। এঁদের সকলেরই প্রথম ধাপের চিকিৎসা ব্যর্থ হয়েছিল। এরপর রোগীদের দুই ভাগে ভাগ করা হয়।
একদলকে প্রতিদিন একবার ডারাক্সনরাসিব ট্যাবলেট দেওয়া হয়, অন্য দলকে চিকিৎসকদের নির্বাচিত কেমোথেরাপি দেওয়া হয়। ছয়টি দেশের একাধিক চিকিৎসাকেন্দ্রে এই পরীক্ষা চালানো হয়।
ফলাফল ছিল অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। গবেষণায় দেখা যায়, নতুন ওষুধ গ্রহণকারী রোগীরা গড়ে প্রায় ১৩ মাস বেঁচে ছিলেন, যেখানে কেমোথেরাপি নেওয়া রোগীদের গড় বেঁচে থাকার সময় ছিল ৭ মাসেরও কম। অর্থাৎ নতুন ওষুধ মৃত্যুঝুঁকি প্রায় ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে সক্ষম হয়েছে।
শুধু বেঁচে থাকার সময়ই নয়, রোগ নিয়ন্ত্রণেও উল্লেখযোগ্য উন্নতি দেখা গেছে। কেমোথেরাপি নেওয়া রোগীদের ক্ষেত্রে গড়ে চার মাসের মধ্যেই ক্যানসার ফের বাড়তে শুরু করলেও, ডারাক্সনরাসিব গ্রহণকারীদের ক্ষেত্রে সেই সময় বেড়ে প্রায় সাত মাসে পৌঁছেছে। পাশাপাশি প্রায় এক-তৃতীয়াংশ রোগীর টিউমারের আকার কমেছে, যা কেমোথেরাপি নেওয়া রোগীদের তুলনায় অনেক বেশি।
রোগীদের জীবনমানেও ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। নতুন ওষুধ গ্রহণকারীদের ব্যথা ধীরে বেড়েছে এবং দৈনন্দিন স্বাভাবিক জীবনযাত্রা দীর্ঘদিন বজায় রাখা সম্ভব হয়েছে। তবে ওষুধটি সম্পূর্ণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ামুক্ত নয়। কিছু রোগীর ক্ষেত্রে ত্বকে র্যা শ, বমিভাব এবং মুখে ঘা-এর মতো সমস্যা দেখা গেলেও, গবেষকদের মতে এগুলি সাধারণত কেমোথেরাপির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার তুলনায় কম গুরুতর এবং নিয়ন্ত্রণযোগ্য।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারের চিকিৎসায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। যদিও ওষুধটি আরও বিস্তৃত মূল্যায়ন এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনের প্রক্রিয়া অতিক্রম করবে, তবুও এই গবেষণা ভবিষ্যতে প্রাণঘাতী এই ক্যানসারের চিকিৎসায় নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে।















