আজকাল ওয়েবডেস্ক: ধারণাটি প্রথম দিয়েছিলেন আলবার্ট আইনস্টাইন। তিনি দেখিয়েছিলেন যে মহাবিশ্বের সব জায়গায় সময় একরকম নয়। কারণ একটি ঘড়ির কাঁটা চলাচলের হার মাধ্যাকর্ষণের উপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করে। তিনি দেখিয়েছিলেন, যেখানে মাধ্যাকর্ষণ বেশি, সেখানে ঘড়ি কিছুটা ধীরে চলে এবং যেখানে মাধ্যাকর্ষণ কম, সেখানে ঘড়ি দ্রুত চলে। এছাড়াও, গোটা পৃথিবীতে সময়ের সমন্বয় সাধন করা একটি জটিল বিষয়। এটি সৌরজগৎ পর্যন্ত বিস্তৃত, যা আরও অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং।

আইনস্টাইনের সেই ধারণাকে সম্বল করেই ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেকনোলজির (এনআইএসটি) পদার্থবিজ্ঞানীরা গণনা করে দেখেছেন যে, মঙ্গল গ্রহের ঘড়িগুলো পৃথিবীর ঘড়ির চেয়ে প্রতিদিন ৪৭৭ মাইক্রোসেকেন্ড (সেকেন্ডের দশ লক্ষ ভাগের এক ভাগ) দ্রুত চলে। এর কারণ, মঙ্গলের প্রসারিত কক্ষপথ এবং অন্যান্য নক্ষত্রের মহাকর্ষীয় প্রভাব। আরও আবিষ্কার হয়েছে যে, মঙ্গল গ্রহের এক বছর জুড়ে এই সময়ের পার্থক্য প্রতিদিন ২২৬ মাইক্রোসেকেন্ড পর্যন্ত পরিবর্তিত হতে পারে।

দ্য অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল জার্নালে সম্প্রতি প্রকাশিত এই গবেষণাটি ২০২৪ সালের একটি গবেষণাপত্রের ওপর ভিত্তি করে করা হয়েছে। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেকনোলজির (NIST) বিজ্ঞানীরা চাঁদে অত্যন্ত নির্ভুল সময় পরিমাপের জন্য একটি কাঠামো প্রস্তাব করেছিলেন। NIST-এর পদার্থবিজ্ঞানী বিজুনাথ পাটলা বলেছেন যে মঙ্গল গ্রহে সঠিকভাবে সময় পরিমাপ করা ভবিষ্যতের অভিযানগুলির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে।

মঙ্গল গ্রহ পৃথিবীর থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ছন্দে চলে, কারণ মঙ্গলের একটি দিন পৃথিবীর দিনের চেয়ে প্রায় ৪০ মিনিট দীর্ঘ, এবং মঙ্গলের এক বছর হয় ৬৮৭টি পার্থিব দিনে, যেখানে পৃথিবীতে এক বছর হয় ৩৬৫ দিনে। এই পার্থক্যগুলি ছাড়াও, বিজ্ঞানীরা জানতে চেয়েছিলেন যে মঙ্গলে সময় ঠিক পৃথিবীর মতোই একই গতিতে প্রবাহিত হয় কিনা।

মঙ্গলে স্থাপন করা একটি পারমাণবিক ঘড়ি স্বাভাবিকভাবেই কাজ করবে এবং পৃথিবীর মতোই টিক টিক করে চলবে। সমস্যাটি দেখা দেয় যখন সেই ঘড়িটিকে পৃথিবীর একটি ঘড়ির সঙ্গে তুলনা করা হয়, কারণ দু’টি ঘড়ি ধীরে ধীরে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে পড়ে। তাই গবেষকদের দু’টি ঘড়ির মধ্যে সঠিক পার্থক্যটি গণনা করতে হয়েছিল, যা অনেকটা একটি গ্রহের টাইম জোন নির্ধারণ করার মতোই।

কাজটি প্রত্যাশার চেয়ে বেশি জটিল প্রমাণিত হয়েছিল। আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার তত্ত্ব অনুসারে, মহাকর্ষ সময়ের প্রবাহকে প্রভাবিত করে। শক্তিশালী মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রে ঘড়ি ধীরে চলে এবং দুর্বল ক্ষেত্রে দ্রুত চলে। মহাকাশে কোনও গ্রহের গতিও সময়কে প্রভাবিত করে, কারণ কক্ষপথের গতি অতিরিক্ত তারতম্য সৃষ্টি করে। গণনাগুলি করার জন্য, এনআইএসটি-র বিজ্ঞানীরা মঙ্গল গ্রহে একটি নির্দিষ্ট নির্দেশক বিন্দু বেছে নেন। যা পৃথিবীর নিরক্ষীয় অঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের অনুরূপ। কয়েক দশকের মঙ্গল অভিযান থেকে সংগৃহীত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে, পাটলা এবং তাঁর সহকর্মী এনআইএসটি পদার্থবিজ্ঞানী নীল অ্যাশবি গ্রহটির পৃষ্ঠের মহাকর্ষ বলের মান অনুমান করেন, যা পৃথিবীর তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ দুর্বল।

তবে, শুধুমাত্র মঙ্গলের মহাকর্ষই এর সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা দিতে পারেনি। সৌরজগৎ একটি ক্রমাগত পরিবর্তনশীল পরিবেশ, যেখানে বিশাল বস্তুগুলি একে অপরের উপর মহাকর্ষীয় শক্তি প্রয়োগ করে। সূর্য, যা সৌরজগতের ৯৯ শতাংশেরও বেশি ভর ধারণ করে, গ্রহগুলোর গতিপথ নির্ধারণে প্রধান ভূমিকা পালন করে।

সৌরজগতে এর অবস্থান, যার মধ্যে সূর্য থেকে দূরত্ব এবং পৃথিবী, চাঁদ, বৃহস্পতি ও শনির মতো প্রতিবেশী বস্তুগুলির সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া অন্তর্ভুক্ত, তার ফলে একটি আরও প্রসারিত এবং উপবৃত্তাকার কক্ষপথ তৈরি হয়। এর বিপরীতে, পৃথিবী এবং চাঁদ তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল কক্ষপথ অনুসরণ করে। ফলস্বরূপ, চাঁদে সময় পৃথিবীর তুলনায় প্রতিদিন প্রায় ৫৬ মাইক্রোসেকেন্ড দ্রুত চলে।

এনআইএসটি-র পদার্থবিজ্ঞানী বিজুনাথ পাটলার ব্যাখ্যা, “কিন্তু মঙ্গলের ক্ষেত্রে বিষয়টি তেমন নয়। সূর্য থেকে এর দূরত্ব এবং এর উপবৃত্তাকার কক্ষপথ সময়ের তারতম্যকে আরও বাড়িয়ে তোলে। থ্রি বডি প্রবলেম অত্যন্ত জটিল। এখন আমরা চারটি বস্তুকে নিয়ে কাজ করছি- সূর্য, পৃথিবী, চাঁদ এবং মঙ্গল।” তিনি আরও বলেন, “কঠিন কাজটি আমি প্রাথমিকভাবে যা ভেবেছিলাম তার চেয়েও বেশি চ্যালেঞ্জিং ছিল।” মঙ্গলের পৃষ্ঠের মহাকর্ষ, কক্ষপথের গতিবিদ্যা এবং সূর্য, পৃথিবী ও চাঁদের মহাকর্ষীয় প্রভাবকে হিসাবে নেওয়ার পর পাটলা এবং অ্যাশবি তাদের চূড়ান্ত গণনায় পৌঁছন।