আজকাল ওয়েবডেস্ক: ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সেই দাবি সরাসরি খারিজ করে দিয়েছেন, যেখানে বলা হয়েছিল যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের হামলা ছিল “প্রি-এম্পটিভ” বা সম্ভাব্য হামলা ঠেকাতে আগাম আঘাত। আরাঘচি বলেন, এই দাবি সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং ইরানের বিরুদ্ধে চালানো “অবৈধ যুদ্ধ”কে ন্যায্যতা দেওয়ার চেষ্টা মাত্র।
সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ এক পোস্টে তিনি বলেন, “ইরান যুক্তরাষ্ট্র বা মার্কিন বাহিনীর উপর হামলার পরিকল্পনা করছিল—এই দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। এটি এমন একটি যুদ্ধকে ন্যায্যতা দেওয়ার প্রচেষ্টা, যা মূলত ইজরায়েলের পরিকল্পনায় শুরু হয়েছে এবং যার মূল্য দিচ্ছে সাধারণ মার্কিন নাগরিকরা।” সোমবার এক সাংবাদিক বৈঠকে ট্রাম্প আবারও দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি আগে আঘাত না করত, তাহলে ইরান “এক সপ্তাহের মধ্যেই” যুক্তরাষ্ট্রের উপর হামলা চালাত।
২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার মাঝেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েল যৌথভাবে তেহরানসহ দেশের বিভিন্ন অংশে বিমান হামলা শুরু করে। তাদের দাবি ছিল, ইরানের পক্ষ থেকে আসন্ন হুমকি ঠেকাতেই এই আগাম হামলা চালানো হয়েছে। তবে ইরানের দাবি, এটি ছিল সম্পূর্ণ অযৌক্তিক আক্রমণ। গত কয়েক সপ্তাহে চলা এই সংঘর্ষে ইতিমধ্যেই ১,২০০-র বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনেই-সহ শতাধিক স্কুলছাত্রীও রয়েছে বলে ইরানি সূত্র দাবি করেছে।
ইরানও পাল্টা আক্রমণ চালিয়ে উপসাগরীয় অঞ্চল ও আরব দেশগুলিতে থাকা একাধিক মার্কিন ঘাঁটি এবং ইজরায়েলের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা করেছে। এই পাল্টা হামলায় বহু ইজরায়েলের নাগরিক ও মার্কিন সেনা হতাহত হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে ইরান গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিয়েছে। এই পথ দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-চতুর্থাংশ জ্বালানি পরিবহন হয়। এর ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়েছে এবং এশিয়ার বহু দেশে রান্নার গ্যাসের সংকট দেখা দিয়েছে।
এই সংঘর্ষের মধ্যেই ইজরায়েল লেবাননে হামলা বাড়িয়েছে। ২ মার্চ থেকে শুরু হওয়া বিমান হামলা ও আংশিক স্থল অভিযানে সেখানে ৬০০-র বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং প্রায় ৮ লক্ষ মানুষ ঘরছাড়া হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। বুধবার জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুটেরেসের সঙ্গে ফোনালাপে আরাঘচি আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে ইরানের আত্মরক্ষার অধিকার আবার তুলে ধরেন। তিনি জানান, যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে ইরান প্রতিবেশী দেশগুলিকে সতর্ক করেছিল—প্রথমে হামলা হলে তারা অঞ্চলের মার্কিন ঘাঁটি ও ইজরায়েলের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করবে।
ইরানের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের যুদ্ধের সময় স্কুল, হাসপাতাল এবং ঐতিহাসিক স্থাপনা সহ বহু বেসামরিক পরিকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। তেহরানের কাছে ইরানি তেলভাণ্ডারও বোমাবর্ষণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইরানের Iranian Red Crescent Society জানিয়েছে, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ২০ হাজার বেসামরিক স্থাপনা হামলার শিকার হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ৭৭টি চিকিৎসাকেন্দ্র, ৬৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং ত্রাণ সহায়তার জন্য ব্যবহৃত ১৬টি জায়গা।
যুদ্ধের প্রথম দিনেই মিনাব শহরের একটি স্কুলে হামলায় ১৬০-র বেশি ছাত্রী নিহত হয়েছে বলে ইরানের দাবি। যদিও ট্রাম্প প্রশাসন এই ঘটনার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। অন্যদিকে জাতিসংঘে ইরানের রাষ্ট্রদূত আমীর সাঈদ ইরাভানি জানিয়েছেন, গত সপ্তাহে বেইরুটের একটি হোটেলে ইজরায়েলের হামলায় চারজন ইরানি কূটনীতিক নিহত হয়েছেন।
ইরানের বিপ্লবী বাহিনী Islamic Revolutionary Guard Corps জানিয়েছে, তারা প্রতিশোধ হিসেবে ইজরায়েল ও মার্কিন লক্ষ্যবস্তুতে ৩৭তম দফার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। তাদের বক্তব্য, “এই অঞ্চলে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা হয় সবার জন্য থাকবে, না হলে কারও জন্যই থাকবে না।” এদিকে ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব আলী লারিজানি সতর্ক করে বলেছেন, যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল করতে দেওয়া হবে না।
তিনি বলেন, “এই প্রণালী হয় সবার জন্য শান্তি ও সমৃদ্ধির পথ হবে, নয়ত যুদ্ধবাজদের জন্য পরাজয় ও দুর্ভোগের পথ হয়ে উঠবে।” বর্তমানে উভয় পক্ষ থেকেই পাল্টা হুমকি ও সামরিক অভিযান চলতে থাকায় সংঘাত থামানোর জন্য এখনো কোনো কার্যকর আন্তর্জাতিক উদ্যোগ সামনে আসেনি। পরিস্থিতি ক্রমেই আরও অনিশ্চিত ও বিপজ্জনক হয়ে উঠছে বলে পর্যবেক্ষকদের আশঙ্কা।
