আজকাল ওয়েবডেস্ক: বিশ্ব আবহাওয়া ব্যবস্থায় বড়সড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণতা। আবহাওয়াবিদদের একাংশের মতে, ২০২৬ সালে শক্তিশালী বা ‘সুপার’ এল নিনো পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। এই আশঙ্কার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এল নিনো যা মূলত মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের পৃষ্ঠের জল অস্বাভাবিক উষ্ণ হয়ে ওঠার ফলে সৃষ্টি হয় এবং যার প্রভাব পড়ে গোটা বিশ্বের আবহাওয়ায়।
এল নিনো কী এবং কেন তা গুরুত্বপূর্ণ?
এল নিনো হল বৃহত্তর চক্রের একটি উষ্ণ পর্যায়। এর বিপরীত অবস্থা হল লা নিনা, যখন একই অঞ্চলের জল তুলনামূলক ঠান্ডা থাকে। সাধারণত এই চক্র ২ থেকে ৭ বছর অন্তর পরিবর্তিত হয়। কিন্তু যখন সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি বেড়ে যায় এবং দীর্ঘ সময় ধরে স্থায়ী হয়, তখন তাকে ‘সুপার এল নিনো’ বলা হয়।
২০২৬ নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আবহাওয়া সংস্থা সতর্ক করেছে যে প্রশান্ত মহাসাগরের উপরের স্তরে দ্রুত তাপ সঞ্চয় হচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণে সমুদ্রের গড় তাপমাত্রা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। এই অতিরিক্ত তাপ ভবিষ্যতের এল নিনোকে আরও শক্তিশালী করে তুলতে পারে।
২০২৩–২৪ সালের এল নিনো ছিল উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী। তার পরবর্তী সময়ে সাময়িকভাবে নিরপেক্ষ অবস্থা দেখা গেলেও, সাব-সারফেস বা সমুদ্রের গভীর স্তরে তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রবণতা বজায় রয়েছে। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, যদি এই সঞ্চিত তাপ পৃষ্ঠে উঠে আসে, তাহলে ২০২৬ নাগাদ পরিস্থিতি ‘সুপার’ পর্যায়ে পৌঁছতে পারে।
সুপার এল নিনোর সম্ভাব্য প্রভাব
সুপার এল নিনো হলে বিশ্বজুড়ে চরম আবহাওয়ার ঘটনা বাড়তে পারে। দক্ষিণ আমেরিকার কিছু অঞ্চলে অতিবৃষ্টি ও বন্যা, আবার অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় খরা দেখা দিতে পারে। ভারতের ক্ষেত্রেও এর বড় প্রভাব পড়ে। অতীতে শক্তিশালী এল নিনো বছরে ভারতের বর্ষা দুর্বল হয়েছে, ফলে কৃষি উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং খাদ্যদ্রব্যের দাম বেড়েছে।
ভারতের মৌসুমি বৃষ্টিপাতের ওপর এল নিনোর প্রভাব সুপরিচিত। বিশেষ করে ধান, ডাল ও তেলের বীজের উৎপাদনে ঘাটতি দেখা দিতে পারে। একই সঙ্গে তাপপ্রবাহের প্রকোপও বাড়তে পারে, যা স্বাস্থ্যঝুঁকি ও বিদ্যুৎ চাহিদা বৃদ্ধি করে।

জলবায়ু পরিবর্তন কি বাড়াচ্ছে ঝুঁকি?
বিজ্ঞানীদের একাংশ মনে করেন, মানুষের তৈরি করা জলবায়ু পরিবর্তন এল নিনোর তীব্রতা বাড়িয়ে তুলছে। বিশ্বের গড় তাপমাত্রা ইতিমধ্যেই শিল্প-পূর্ব যুগের তুলনায় প্রায় ১.২–১.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি।
এখন কী দেখার?
২০২৬ যে নিশ্চিতভাবেই সুপার এল নিনো হবে, এমনটা বলা যাচ্ছে না। তবে সমুদ্রের তাপমাত্রার বর্তমান প্রবণতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে ঝুঁকি বাড়ছে একথা স্পষ্ট। আগামী কয়েক মাসে প্রশান্ত মহাসাগরের সাব-সারফেস তাপমাত্রা ও বায়ুপ্রবাহের পরিবর্তনই ঠিক করে দেবে পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে।
বিশ্ব অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং জনস্বাস্থ্যের ওপর সম্ভাব্য প্রভাবের কথা মাথায় রেখে এখন থেকেই সতর্কতা ও প্রস্তুতি নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। ২০২৬ আদৌ ‘সুপার এল নিনো’ বছর হবে কি না, তা সময়ই বলবে—কিন্তু সতর্ক সংকেত ইতিমধ্যেই স্পষ্ট।
