আজকাল ওয়েবডেস্ক: কেরলের রাজনীতিতে দীর্ঘ দশ দিনের টানাপোড়েন আর জল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে নয়া অধ্যায়ের সূচনা হল। কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (UDF) নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও মুখ্যমন্ত্রী কে হবেন, তা নিয়ে যে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছিল, বৃহস্পতিবার তার ইতি টানলেন এআইসিসি (AICC) সাধারণ সম্পাদক দীপা দাশমুন্সি। তাঁর ঘোষণায় স্পষ্ট হয়ে গেল, কেরলের পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী হতে চলেছেন ভি. ডি. সতীশন। এই খবরের সাথে সাথেই রাজ্যে উৎসবের মেজাজ শুরু হয়েছে, বিশেষ করে এর্নাকুলামের পারাভুর এলাকায়, যেখান থেকে সতীশন ছ’বারের বিধায়ক।
৬২ বছর বয়সী এই নেতার উত্থান কোনও রূপকথার চেয়ে কম নয়। ২০২১ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত পিনারাই বিজয়নের দ্বিতীয় সরকারের আমলে বিরোধী দলনেতা হিসেবে নিজেকে তিলে তিলে তৈরি করেছিলেন তিনি। তাঁর লড়াইটা সহজ ছিল না, কারণ দলের অন্দরেই কে. সি. ভেনুগোপাল এবং রমেশ চেন্নিথালার মতো হেভিওয়েট নেতাদের চ্যালেঞ্জ সামলাতে হয়েছে তাঁকে। কিন্তু সতীশন নিজের ঘরোয়া স্টাইল আর সাধারণ মানুষের সাথে সংযোগের জোরেই আজ এই শীর্ষ পদে। পিনারাই বিজয়নের মতো 'লৌহমানবে'র বিপরীতে দাঁড়িয়ে তিনি কোনও পেশিবহুল বা আক্রমণাত্মক রাজনীতির পথ বেছে নেননি, বরং নিজের আঞ্চলিক টান বা এর্নাকুলামের স্থানীয় বৈশিষ্ট্য বজায় রেখেই মানুষের মন জয় করেছেন।
সতীশনের রাজনীতির বিশেষত্ব ছিল তথ্যের নির্ভুলতা। তিনি কেবল দুর্নীতির অভিযোগ তুলেই ক্ষান্ত হননি, বরং এআই ক্যামেরা প্রজেক্ট বা কে-ফন (K-FON)-এর মতো বিষয়গুলোতে সরকারের গাফিলতি তথ্যসহ সাধারণ মানুষের সামনে এনেছেন। গত দশ বছর ধরে কংগ্রেসের ওপর অভিযোগ ছিল যে তারা সিপিআই(এম) এবং বিজেপির গোপন আঁতাত নিয়ে সরব নয়। সতীশন সেই ছবিটা বদলে দেন। তিনি ধারাবাহিকভাবে এই 'অশুভ আঁতাত' নিয়ে সরব হন এবং একে নির্বাচনী হাতিয়ারে পরিণত করেন। এমনকি সবরিমালা সোনা চুরির মামলা বা ধর্মীয় তোষণের রাজনীতির প্রশ্নেও তিনি সরাসরি মুখ্যমন্ত্রীকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন।
রাজনীতির লড়াইয়ে সতীশনকে দমাতে কম চেষ্টা করেনি বামপন্থী শিবির। তাঁকে আক্রমণ করে 'নুনেশন' বা 'মিথ্যেবাদী' বলে দাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল সামাজিক মাধ্যমে। ব্যক্তিগত আক্রমণ থেকে শুরু করে চরিত্রহনন— সব সয়েই তিনি রাজনীতিটা করে গেছেন। মাঝেমধ্যে মেজাজ হারিয়ে ফেললেও দ্রুত তা সংশোধন করে নিতেন। তাঁর 'টিম ইউডিএফ' ধারণাটিই জোটকে এই জয় এনে দিতে বড় ভূমিকা রেখেছে। এক সময় পিনারাই বিজয়ন তাঁর সাথে প্রকাশ্য বিতর্কে বসতে অস্বীকার করেছিলেন, কিন্তু সতীশন দমে যাননি। নির্বাচনের আগে তিনি ঘোষণা করেছিলেন, ১০০-র বেশি আসন না জিতলে তিনি সন্ন্যাস নেবেন। তাঁর সেই আত্মবিশ্বাসই আজ তাঁকে এই চেয়ারে বসিয়েছে।
তবে সতীশনের সামনে চ্যালেঞ্জ অনেক। পরিবেশবান্ধব বড় প্রজেক্টের ব্যাপারে তাঁর যে কড়া অবস্থান ছিল, কিংবা কেরলের ধর্মনিরপেক্ষতা বজায় রাখার যে অঙ্গীকার তিনি করেছেন— ক্ষমতার মসনদে বসেও তিনি সেই আদর্শে অটল থাকতে পারেন কি না, এখন সেদিকেই তাকিয়ে গোটা রাজ্য। কেরালার মানুষ এখন দেখার অপেক্ষায়, 'পুতুযুগ' বা নতুন যুগের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসা এই নেতা কতটা সফল হন।
















