আজকাল ওয়েবডেস্ক: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত বিতর্কিত আন্তর্জাতিক উদ্যোগ ‘বোর্ড অব পিস’-এ যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ পেয়েছে ভারত। গাজা যুদ্ধের পরবর্তী ব্যবস্থাপনার নামে গঠিত এই বোর্ডকে ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে ইতিমধ্যেই তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। সমালোচকদের মতে, এটি কার্যত জাতিসংঘকে পাশ কাটিয়ে ট্রাম্পের নেতৃত্বে একটি সমান্তরাল আন্তর্জাতিক শাসন কাঠামো তৈরির চেষ্টা।

তবে এই আমন্ত্রণ গ্রহণ করা হবে কি না, সে বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি নয়াদিল্লি। সরকারের পক্ষ থেকে বিষয়টি নিয়ে নীরবতা বজায় রাখা হয়েছে, যদিও কূটনৈতিক মহলে স্পষ্ট যে সিদ্ধান্তটি ভারতের জন্য মোটেই সহজ নয়।

১৬ জানুয়ারি তারিখে লেখা এক চিঠিতে ট্রাম্প প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে আহ্বান জানান তাঁর সঙ্গে যুক্ত হয়ে “মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক সংঘাত সমাধানের এক ঐতিহাসিক ও মহৎ প্রয়াসে” অংশ নিতে। এই চিঠিটি ১৮ জানুয়ারি রাতে ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর এক্স-এ প্রকাশ করেন।

চিঠিতে ‘বোর্ড অব পিস’-কে বর্ণনা করা হয়েছে “এতদিনের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী ও পরিণামদর্শী বোর্ড” হিসেবে, যা একটি নতুন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও অন্তর্বর্তী শাসনব্যবস্থা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। এই ভাষাই মূলত উদ্বেগ বাড়িয়েছে, কারণ এতে জাতিসংঘের বিকল্প হিসেবে একটি ট্রাম্প-নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর ইঙ্গিত স্পষ্ট।

টাইমস অব ইজরায়েলের হাতে আসা বোর্ডের খসড়া বিধিতে বলা হয়েছে, “দীর্ঘমেয়াদি শান্তির জন্য প্রয়োজন বাস্তববুদ্ধি, সাধারণ বোধ ও এমন পথ বেছে নেওয়ার সাহস, যা অতীতে ব্যর্থ প্রতিষ্ঠান ও পদ্ধতির বাইরে যায়।” এতে গাজার নাম সরাসরি উল্লেখ না থাকায় আরও জোরালো হয়েছে সেই ধারণা যে ট্রাম্প এই বোর্ডকে ভবিষ্যতে বিশ্বজুড়ে সংঘাত ব্যবস্থাপনার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চান।

বোর্ডের কাঠামো নিয়ে সবচেয়ে বিতর্কিত দিকগুলির একটি হলো অর্থনৈতিক শর্ত। খসড়া বিধি অনুযায়ী, যেসব দেশ প্রথম বছরের মধ্যেই এক বিলিয়ন ডলার দেবে, তাদের ক্ষেত্রে তিন বছরের মেয়াদ প্রযোজ্য হবে না—অর্থাৎ কার্যত স্থায়ী সদস্যপদ। বোর্ডের চেয়ারম্যান হবেন স্বয়ং ডোনাল্ড ট্রাম্প। সদস্য নির্বাচন, মেয়াদ বৃদ্ধি এবং আর্থিক অনুমোদনের পূর্ণ ক্ষমতা থাকবে তাঁর হাতে। ইউরোপীয় কূটনীতিকদের একাংশ একে “ট্রাম্প ইউনাইটেড নেশনস” বলে আখ্যা দিয়েছেন।

প্রায় ৬০টি দেশকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে- এর মধ্যে রয়েছে তুরস্ক, মিশর, পাকিস্তান, আর্জেন্টিনা, ইতালি, ব্রিটেন, জার্মানি, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, উপসাগরীয় দেশগুলি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের একাধিক সদস্য রাষ্ট্র। পাকিস্তান ইতিমধ্যেই আমন্ত্রণ পাওয়ার কথা স্বীকার করেছে। আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলে ও হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবান প্রকাশ্যে ট্রাম্পের প্রস্তাব গ্রহণের কথা ঘোষণা করেছেন। অন্যদিকে তুরস্ক, মিশর ও জর্ডন বিষয়টি “পর্যালোচনার” কথা জানিয়েছে।

বোর্ডের নির্দেশ কার্যকর করতে একটি সাত সদস্যের নির্বাহী বোর্ড গঠন করা হয়েছে, যেখানে মার্কিন আধিপত্য স্পষ্ট। সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, ট্রাম্পের জামাই জ্যারেড কুশনার, বিশ্বব্যাঙ্ক প্রধান অজয় বাঙ্গা এবং প্রাক্তন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার।
গাজায় হামাসকে নিরস্ত্র করতে এবং পুনর্গঠনের সময় এলাকা দখলে রাখতে একটি আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী মোতায়েন করা হবে, যার নেতৃত্ব দেবেন মার্কিন মেজর জেনারেল জ্যাসপার জেফার্স। একইসঙ্গে একটি প্যালেস্টাইনের টেকনোক্র্যাট কমিটি অন্তর্বর্তী শাসন চালাবে বলে জানানো হয়েছে।

আশ্চর্যজনকভাবে, এই পরিকল্পনার কিছু দিক নিয়ে প্রকাশ্যে আপত্তি তুলেছে ইজরায়েলও। তুরস্ক ও কাতারের প্রতিনিধিদের গাজা নির্বাহী বোর্ডে অন্তর্ভুক্ত করা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। ইউরোপীয় দেশগুলির মধ্যেও অসন্তোষ বাড়ছে, বিশেষত ট্রাম্পের একচ্ছত্র আর্থিক নিয়ন্ত্রণ এবং জাতিসংঘকে কার্যত পাশ কাটিয়ে যাওয়ার প্রবণতা নিয়ে।

ভারতের জন্য এই সিদ্ধান্ত আরও জটিল। একদিকে ঐতিহাসিকভাবে প্যালেস্টাইন রাষ্ট্রের পক্ষে অবস্থান, অন্যদিকে গত দেড় দশকে ইজরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা, এই দ্বৈত কূটনীতির মাঝেই এখন ট্রাম্পের প্রস্তাব।

২০২৫ সালের অক্টোবরে ট্রাম্পের গাজা পরিকল্পনাকে প্রকাশ্যে একাধিকবার সমর্থন করেছিলেন নরেন্দ্র মোদি। আটটি ভাষায় দেওয়া সেই সমর্থনকে বিশ্লেষকেরা দেখেছিলেন ট্রাম্পের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক মেরামতের প্রয়াস হিসেবে, বিশেষত ভারতীয় পণ্যে ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের পর।

এছাড়া বোর্ডে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্তি, গ্লোবাল সাউথে ভারতের ভাবমূর্তি, এবং জাতিসংঘের ভূমিকা দুর্বল করার সম্ভাবনা। সব মিলিয়ে নয়াদিল্লির সামনে কূটনৈতিক লাভ-ক্ষতির হিসাব অত্যন্ত সূক্ষ্ম। বিশেষ করে ভারতের নিজের সীমান্ত বিরোধ ও বহুপাক্ষিক কাঠামোর ওপর নির্ভরতার প্রেক্ষিতে, ট্রাম্প-নিয়ন্ত্রিত এই ব্যবস্থায় যোগ দেওয়া ভবিষ্যতে কী বার্তা দেবে তা নিয়েও উদ্বেগ প্রবল।সব মিলিয়ে, ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’ ভারতের সামনে শুধুই একটি আমন্ত্রণ নয়, বরং এক গভীর কূটনৈতিক পরীক্ষা।