আজকাল ওয়েবডেস্ক: মহারাষ্ট্রের আহিল্যানগর (আগের আহমেদনগর) জেলার সাউন্ডালা গ্রামে গত ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ এক বিশেষ গ্রামসভার আয়োজন ছিল। কিন্তু সভা শুরু হওয়ার আগেই ঘটল এক তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। গ্রামের সরপঞ্চ শারদরাও আর্গাডে প্রথমে আয়োজন করলেন স্বেচ্ছায় রক্তদান শিবির। দু’শোরও বেশি গ্রামবাসী অংশ নিলেন সেই শিবিরে।
দ্যা ওয়্যার-এর প্রতিবেদন অনুসারে, রক্তদান পর্ব শেষ হয়ে যখন গ্রামসভা শুরু হল, তখন আর্গাডের কণ্ঠে ধ্বনিত হল এক বার্তা, যা মুহূর্তেই সভার আবহ নির্ধারণ করে দিল। তিনি বললেন, “আমাদের রক্ত সবুজ বা নীল নয়, রক্তের রং একটাই—লাল। আর একবার মিশে গেলে সেই রক্ত আর কেউ আলাদা করতে পারবে না।” এই বক্তব্য যেন গ্রামবাসীদের মন ছুঁয়ে গেল। তার পরেই তিনি প্রস্তাব রাখলেন— সাউন্ডালাকে “জাতপাত-মুক্ত” গ্রাম হিসেবে ঘোষণা করা হোক।
গ্রামসভায় সর্বসম্মতভাবে একটি বিশেষ প্রস্তাব গৃহীত হয়। মারাঠি ভাষায় লেখা সেই প্রস্তাবের শুরুতেই উল্লেখ করা হয়েছে ভারতের সংবিধান ও তার প্রস্তাবনার মূল আদর্শ— স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের কথা। প্রস্তাবে বলা হয়েছে, “আজ থেকে সাউন্ডালা গ্রামে কেউ জাত মানবে না বা কোনও রকম জাতপাতের চর্চা করবে না। মানবতাই হবে একমাত্র ধর্ম।” গ্রামসভায় উপস্থিত ছিলেন সাভর্ণ ও বহুজাতি সম্প্রদায়ের মানুষ, এমনকি কয়েকজন মুসলিম বাসিন্দাও। সকলে মিলে সর্বসম্মতভাবে এই প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেন।
আহিল্যানগর জেলা দীর্ঘদিন ধরেই জাতিগত অত্যাচার ও সাম্প্রদায়িক অশান্তির জন্য পরিচিত। ২০১৩ সালের সোনাই ত্রিমুখী খুন, ২০১৪ সালের জাভখেড়ে ত্রিমুখী খুন এবং একই বছরে খারদায় ১৭ বছরের এক দলিত যুবকের তথাকথিত ‘অনার কিলিং’— এই সব ঘটনাই জেলার ইতিহাসে কালো দাগ হয়ে রয়েছে। বহু বছর ধরে এই জেলা ‘অ্যাট্রোসিটি প্রোন ডিস্ট্রিক্ট’-এর তালিকায় ছিল।
সাউন্ডালা গ্রামও এর ব্যতিক্রম ছিল না। সরপঞ্চ আর্গাডে স্বীকার করেন, “আমাদের গ্রামেও জাতিগত হিংসার ঘটনা ঘটেছে। অত্যাচার দমন আইনের অধীনে মামলাও হয়েছে।” তবে তিনি দাবি করেন, গত কয়েক বছরে ধারাবাহিক সামাজিক সচেতনতা কর্মসূচির ফলে পরিস্থিতির বদল ঘটেছে। “এখন মানুষ একে অপরের বাড়িতে যায়, অনুষ্ঠানে অংশ নেয়, বিপদে পাশে দাঁড়ায়,” বলেন তিনি।
গ্রামটি এখনও পর্যন্ত আন্তঃজাত বা আন্তঃধর্ম বিবাহের সাক্ষী হয়নি। তবে আর্গাডে আশাবাদী। তাঁর কথায়, “এই ধরনের প্রস্তাব ভবিষ্যতে মানুষকে সেই দিকে এগোতে উৎসাহ দেবে।” প্রস্তাবে আরও বলা হয়েছে, সংবিধানের চেতনার বিরুদ্ধে কোনও আচরণ করলে শাস্তির বিধান থাকবে। আর্গাডে জানান, “গ্রামবাসীরা জানেন, এখানে থাকতে হলে এই নিয়ম মানতেই হবে। আর এই নিয়ম দেশের আইন বা সংবিধানের পরিপন্থী নয়, তাই বাস্তবায়নে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।”
সাউন্ডালা গ্রাম এর আগেও একাধিক সামাজিক সংস্কারমূলক প্রস্তাব গ্রহণ করেছে। শিশু বিবাহ নিষিদ্ধ করা, বিধবা বিবাহের অনুমতি, পণপ্রথা ও গার্হস্থ্য হিংসার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, মেয়েদের উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করা এবং গ্রামীণ রাজনীতি ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে মহিলাদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি— এই সব ক্ষেত্রেই গ্রামসভা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই ধারাবাহিকতারই সর্বশেষ পদক্ষেপ হল ‘জাতপাত-মুক্ত’ ঘোষণা।
এই সিদ্ধান্তের সময়কালও তাৎপর্যপূর্ণ। সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীদের আত্মহত্যা রুখতে ইউজিসি যে বিধিনিষেধ জারি করেছে, তা নিয়ে দেশজুড়ে প্রতিবাদ হয়েছে। সেই আন্দোলনে সাভর্ণ-বহুজাতি বিভাজন স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। এই প্রেক্ষাপটে আর্গাডের মন্তব্য, “শাসক দলগুলো দেশকে হিন্দু-মুসলিম, উঁচু-নিচু জাতের বিভাজনে ভাঙতে চায়। আমরা ছোট্ট গ্রাম স্তরে সেই বিভাজনের বিরুদ্ধেই দাঁড়াতে চাই।”
সাউন্ডালার এই সিদ্ধান্ত হয়তো একদিনে শতাব্দীপ্রাচীন জাতপাত প্রথা মুছে দিতে পারবে না। কিন্তু এক গ্রাম যদি সংবিধানের চেতনায় বিশ্বাস রেখে সামাজিক ঐক্যের শপথ নিতে পারে, তবে তা অন্যদের কাছেও অনুপ্রেরণা হয়ে উঠতে পারে। সাউন্ডালার মানুষ অন্তত একদিনের জন্য দেখালেন— রক্তের রং একটাই, আর সেই লাল রং-ই হয়তো ভবিষ্যতের নতুন সামাজিক বন্ধনের প্রতীক।
