আজকাল ওয়েবডেস্ক: সামনে ভালোবাসা দিবস আর তার সঙ্গেই বিয়ের মরশুম- দুইয়ে মিলে হিমাচলের পাহাড়ি শহর শিমলায় ফুলের বাজার এখন রীতিমতো গরম। প্রেমের প্রতীক লাল। তাই লাল গোলাপের চাহিদাই সবথেকে বেশি। আর সেই সুযোগে বাজারে একটি গোলাপের দাম ১০০ টাকা পর্যন্ত ছাড়িয়ে গিয়েছে। আর এর জেরেই রীতিমত মাথায় হাত তরুণ তরুণীদের। 

সাধারণ সময়ে যে গোলাপ ২০ থেকে ৫০ টাকায় পাওয়া যায়, এখন তার দর আকাশছোঁয়া। শিমলার ফুল ব্যবসায়ী অমিত সুদ জানালেন, চড়া দাম হলেও সাধারণ মানুষের উন্মাদনায় বিন্দুমাত্র ভাটা পড়েনি। খুচরো গোলাপ হোক বা সুন্দর করে সাজানো তোড়া, বিক্রি হচ্ছে দেদার। সামনে শিবরাত্রি এবং দোল পূর্ণিমা থাকায় ব্যবসার পালে আরও হাওয়া লাগবে বলে আশা করছেন ব্যবসায়ীরা।

বাজারের হাল বলছে, একটি লাল গোলাপের দাম এখন ৮০ থেকে ১২০ টাকা। কার্নেশন বিকোচ্ছে ৫০ টাকায়। একগুচ্ছ লিলি বা টিউলিপের দাম ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত পৌঁছেছে। অথচ হিমাচলে গোলাপের চাষ হয় তুলনায় কম। তাই এই বিপুল চাহিদা সামাল দিতে বাইরে থেকে গোলাপ আনিয়ে বাজার সামাল দিতে হচ্ছে বিক্রেতাদের।

হিমাচল প্রদেশে ফুল চাষের বাজার প্রায় ১০০ কোটি টাকার। সোলান, সিরমৌর, শিমলা বা কাংড়া জেলায় প্রচুর পরিমাণে কার্নেশন, চন্দ্রমল্লিকা এবং লিলির চাষ হয়। প্রায় ১,২৭০টিরও বেশি পরিবার সরাসরি এই ফুল চাষের সঙ্গে যুক্ত। উদ্যানপালন দপ্তরের মতে, ভ্যালেন্টাইনস ডে আর বিয়ের মরশুম মিলে যাওয়ায় চাষিরা এবার বেশ লাভের মুখ দেখছেন।

প্রসঙ্গত, ১৪ ফেব্রুয়ারি ভ্যালেন্টাইনস ডে বিশ্বজুড়ে ভালোবাসার দিন হিসেবে পরিচিত। তবে ভারতে এই উদ্‌যাপন এখন আর একদিনে সীমাবদ্ধ নেই- পুরো এক সপ্তাহ জুড়েই চলছে প্রেম, উপহার আর চমকের উৎসব। ‘ভ্যালেন্টাইনস উইক’ ঘিরে তরুণ-তরুণীদের উচ্ছ্বাস যেমন বেড়েছে, তেমনই বেড়েছে অনলাইন কেনাকাটার ঝড়। ই-কমার্স ও ফুড ডেলিভারি প্ল্যাটফর্মগুলিতে রীতিমতো রেকর্ড ভাঙা বিক্রি হচ্ছে গোলাপ, চকোলেট, কেক ও নানা রোম্যান্টিক উপহারের।

৭ ফেব্রুয়ারি ‘রোজ ডে’ দিয়ে শুরু। তারপর ‘চকোলেট ডে’, ‘টেডি ডে’, ‘প্রমিস ডে’, ‘হাগ ডে’- প্রতিটি দিনের আলাদা তাৎপর্য। এই সপ্তাহজুড়ে প্রেমিক-প্রেমিকারা একে অপরকে চমক দিতে ব্যস্ত। শহর থেকে মফস্বল- সব জায়গাতেই এখন ভালোবাসার বাজার গরম।

অনলাইন ডেলিভারি সংস্থাগুলির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ বছর ভ্যালেন্টাইনস উইকে বিক্রির হার আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। ফুড ডেলিভারি প্ল্যাটফর্ম জোম্যাটোর দ্রুত ডেলিভারি শাখা ‘ব্লিঙ্কিট’-এর সিইও অলবিন্দর ধিন্ডসা সামাজিক মাধ্যমে জানিয়েছেন, ৯ ফেব্রুয়ারি ‘চকোলেট ডে’-তে সংস্থাটি প্রতি মিনিটে ৪০৬টি চকোলেট বা চকোলেট বক্স ডেলিভারি করেছে।

তিনি লেখেন, “এই মুহূর্তে পিক চলছে- প্রতি মিনিটে ৪০৬ চকোলেট যাচ্ছে। আগামী ১০ মিনিটে ২০ হাজারেরও বেশি চকোলেট গ্রাহকদের হাতে পৌঁছে যাবে।” অন্যদিকে, জনপ্রিয় গিফটিং প্ল্যাটফর্ম এফএনপি জানিয়েছে, ভ্যালেন্টাইনস ডে-র আগের দিনগুলিতে তারা প্রতি মিনিটে ৩৫০টি গোলাপ ডেলিভারি করেছে। সংস্থার দাবি, এটি তাদের ইতিহাসে সর্বোচ্চ অর্ডারের রেকর্ড।

শুধু ফুল বা চকোলেট নয়, ভ্যালেন্টাইনস ডে-কে ঘিরে কেকের চাহিদাও বিপুল হারে বেড়েছে। ফুড ডেলিভারি প্ল্যাটফর্ম সুইগির সিইও রোহিত কাপুর জানান, ১৩ ফেব্রুয়ারি রাত থেকেই কেকের অর্ডার হু হু করে বাড়তে শুরু করে। রাত ১০টার দিকে সর্বোচ্চ সংখ্যক অর্ডার আসে। তাঁর কথায়, “ভারত ভালোবাসা আর সামান্য পরিকল্পনা নিয়ে ভি-ডে-কে স্বাগত জানিয়েছে। কেক পার মিনিট আজ আরও বাড়বে।”

কেন বাড়ছে এই উন্মাদনা?

বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ। প্রথমত, তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সম্পর্ক ও ভালোবাসা নিয়ে খোলামেলা মনোভাব তৈরি হয়েছে। দ্বিতীয়ত, ক্রমবর্ধমান ডিসপোজেবল ইনকাম বা হাতে খরচযোগ্য আয় বেড়েছে, ফলে উপহার কেনার প্রবণতা বাড়ছে। তৃতীয়ত, ই-কমার্স সংস্থাগুলির আক্রমণাত্মক প্রচার, ডিসকাউন্ট ও ‘সেম ডে ডেলিভারি’-র মতো সুবিধা এই কেনাকাটাকে সহজ ও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

ডেটিং অ্যাপ ও সোশ্যাল মিডিয়ারও বড় ভূমিকা রয়েছে। অনলাইন সংযোগ যত বাড়ছে, ততই বেড়েছে বিশেষ দিনগুলোকে স্মরণীয় করে তোলার প্রতিযোগিতা।

এই উন্মাদনা আর শুধু মেট্রো শহরে সীমাবদ্ধ নয়। টিয়ার-টু ও টিয়ার-থ্রি শহর থেকেও প্রচুর অর্ডার আসছে বলে জানিয়েছে সংস্থাগুলি। অনলাইন পেমেন্ট ও দ্রুত লজিস্টিক ব্যবস্থার ফলে দেশের প্রায় সর্বত্রই এখন ‘ভ্যালেন্টাইনস উইক’ পৌঁছে গেছে। অর্থনীতিবিদদের একাংশ মনে করছেন, এই প্রবণতা কেবল আবেগের প্রকাশ নয়, বরং ভারতের বদলে যাওয়া ক্রেতা সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি। উৎসব এখন শুধু ধর্মীয় বা জাতীয় নয়- ব্যক্তিগত সম্পর্কও হয়ে উঠছে বড় অর্থনৈতিক ইভেন্ট।

সব মিলিয়ে বলা যায়, ভারতে এখন কিউপিডের তীর শুধু হৃদয়েই নয়, বাজারেও লাগছে সমান জোরে। যদি এই ধারা বজায় থাকে, তবে আগামী বছরগুলোতে ভ্যালেন্টাইনস উইক আরও বড় আকার নেবে- আর ডেলিভারি সংস্থাগুলিকে হয়তো সত্যিই আরও বড় ‘লাভ ব্যাগ’ প্রস্তুত রাখতে হবে।