আজকাল ওয়েবডেস্ক: ভারতের সিলিকন ভ্যালি হিসেবে বেঙ্গালুরুর পরিচিতি আজ বিশ্বজুড়ে। কিন্তু আপনি কি জানেন, বেঙ্গালুরু শহরের রাস্তায় বৈদ্যুতিক আলো জ্বলারও তিন বছর আগে কর্ণাটকের অন্য এক প্রান্ত বিদ্যুতের আলোয় ঝলমলিয়ে উঠেছিল? ভারতের প্রযুক্তিগত ইতিহাসের সেই বিস্ময়কর অধ্যায়টি আজও অনেকের কাছে অজানা।

ভারতের বৈদ্যুতিক ইতিহাসের কথা উঠলেই অনেকের চোখে ভেসে ওঠে আধুনিক বেঙ্গালুরুর ছবি। কিন্তু ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, ১৯০৫ সালে বেঙ্গালুরুর রাস্তায় আলো জ্বলার ঢের আগেই কর্ণাটকের মাণ্ড্য জেলার শিবনাসমুদ্র জলপ্রপাত এক মহাবিপ্লবের সাক্ষী হয়েছিল। এখানেই এশিয়ার প্রথম জলবিদ্যুৎ প্রকল্পটি গড়ে তোলা হয়েছিল, যা সেই সময়ে দাঁড়িয়ে ছিল এক অকল্পনীয় ইঞ্জিনিয়ারিং।

ভারতে বিদ্যুতের ব্যবহার শুরু হয়েছিল ব্রিটিশ আমলে। তবে শুরুতে তা ছিল মূলত সরকারি পরিকাঠামোয় সীমাবদ্ধ। ১৮৭৯ সালের ২৪ জুলাই প্রথমবারের মতো কলকাতার রাস্তায় বৈদ্যুতিক বাতি জ্বালানো হয়। মশাল আর তেলের প্রদীপের বদলে বৈদ্যুতিক বাল্বের সেই আলো দেখে শহরবাসী সেদিন স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলেন। তবে শহর হিসেবে পূর্ণাঙ্গ বিদ্যুতায়নের কৃতিত্ব কিন্তু কলকাতার নয়, বরং কর্ণাটকের কোলার গোল্ড ফিল্ডস বা কে.জি.এফ (KGF)-এর।

কোলারে সোনার খনি খনন করার জন্য বিপুল পরিমাণ শক্তির প্রয়োজন ছিল। সেই বাণিজ্যিক এবং শিল্পক্ষেত্রের তাগিদেই ১৯০২ সাল নাগাদ খনির যন্ত্রপাতি এবং কর্মীদের আবাসে বিদ্যুৎ সংযোগ পৌঁছে দেওয়ার কাজ শুরু হয়। কাবেরী নদীর জলকে কাজে লাগিয়ে শিবনাসমুদ্র জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রে উৎপাদিত বিদ্যুৎ সুদীর্ঘ ১৪৭ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছে যেত কোলারে। সেই সময়ে এটিই ছিল বিশ্বের দীর্ঘতম বৈদ্যুতিক লাইন বা ট্রান্সমিশন লাইন।

বিদ্যুৎ, পরিশ্রুত পানীয় জল এবং উন্নতমানের ক্লাবের মতো আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধার কারণে কোলার গোল্ড ফিল্ডস বা কে.জি.এফ এলাকাটি 'লিটল ইংল্যান্ড' নামে পরিচিতি পায়। লন্ডনের জীবনযাত্রার সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার মতো পরিকাঠামো ছিল এই খনি অঞ্চলে। এই সমৃদ্ধ শিল্প ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটই পরবর্তীকালে জনপ্রিয় 'কেজিএফ' চলচ্চিত্র সিরিজের অনুপ্রেরণা হয়ে দাঁড়ায়, যা কোলারের এই ঐতিহাসিক গুরুত্বকে বিশ্ববাসীর সামনে নতুন করে তুলে ধরেছে।

কলকাতায় প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক কাজে বিদ্যুতের ব্যবহার এবং কোলারে সামগ্রিক নগরায়ন ও শিল্পের কাজে বিদ্যুতের প্রসার— এই দুই মাইলফলকই ভারতের আধুনিক পরিকাঠামো গড়ে তোলার ভিত্তি স্থাপন করেছিল। ১৯০৫ সালে দিল্লি পর্যন্ত বিদ্যুৎ পৌঁছানোর আগেই এই দুই কেন্দ্র ভারতের প্রযুক্তিগত সক্ষমতার পরিচয় দিয়েছিল বিশ্বকে। আজ যখন আমরা একটি ডিজিটাল ভারতের কথা বলি, তখন শিবনাসমুদ্র বা কোলারের সেই পুরনো পাওয়ার হাউসগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় এক শতাব্দী আগের সেই অদম্য জেদ আর মেধার কথা।