আজকাল ওয়েবডেস্ক: ব্রিটেনের কুখ্যাত ট্যাবলয়েড সংবাদমাধ্যমে মার্চ মাসের নিস্তরঙ্গ রাজনৈতিক আবহে যেন বজ্রপাতের মতো নেমে এল এক নাম— পামেলা। পামেলা বোর্ডেস, পামেলা চৌধুরী কিংবা পামেলা সিং— কোন পরিচয়টি আসল তা তখন আর গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। ট্যাবলয়েডগুলোর সামনে তিনি ছিলেন একসাথে Mata Hari-এর রহস্যময় গুপ্তচর এবং Linda Lovelace-এর যৌন উত্তেজনায় মোড়া প্রতিচ্ছবি। ২৭ বছর বয়সী এই ভারতীয় সুন্দরী রাতারাতি ব্রিটেনের প্রথম সারির খবর হয়ে ওঠেন— অভিযোগ, তিনি উচ্চবিত্ত কলগার্ল, যাঁর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন প্রভাবশালী মন্ত্রীরা, ক্ষমতাশালী সাংবাদিক, অস্ত্র ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে লিবিয়ার গোয়েন্দা কর্মকর্তারা।
ঘটনার আরও গুরুতর দিক ছিল নিরাপত্তা প্রসঙ্গ। কারণ, টরি পার্টির সাংসদ ডেভিড শ-এর গবেষণা সহকারী হিসেবে পামেলার ছিল ব্রিটিশ পার্লামেন্টে অবাধ যাতায়াতের অনুমতি। একজন বিদেশি মহিলা কীভাবে এতো সহজেই ব্রিটেনের রাজনৈতিক শক্তির কেন্দ্রবিন্দুতে প্রবেশ করলেন এবং সেখানেই প্রভাবশালী নেতৃত্বের সঙ্গে সম্পর্ক গড়লেন— এই প্রশ্নই গোটা ঝড়ের কেন্দ্রবিন্দুতে।
প্রথম আলোড়ন তোলে এক ট্যাবলয়েড রিপোর্ট, যেখানে দাবি করা হয়— পামেলা যৌনসেবা দিতেন ঘণ্টা বা সপ্তাহান্ত অনুযায়ী নির্দিষ্ট অঙ্কের বিনিময়ে। এরপর অভিযোগ ওঠে— তাঁর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে লিবিয়া-সংযোগ এবং বহু ভুয়ো পরিচয় ব্যবহার। সংবাদপত্রগুলোতে তাঁর অতীত, প্রেমজীবন, সম্পর্ক ও গোপন যোগাযোগ নিয়ে দৈনিক নতুন স্বীকারোক্তি, গুজব এবং ‘এক্সক্লুসিভ ফটো’ প্রকাশ পেতে থাকে।
তবে সব থামিয়ে দেন পামেলা নিজেই— নির্জনে লুকিয়ে থাকা অবস্থায় একটি বার্তায় তিনি জানান, তাঁর কাছে এমন "অবিশ্বাস্য গোপন তথ্য" রয়েছে যা প্রকাশ করা হলে "সরকার পড়ে যেতে পারে"। পূর্ববর্তী Christine Keeler–John Profumo কেলেঙ্কারির সঙ্গে তুলনা টেনে তিনি বলেন— "আমার কাছে যা আছে, তা Profumo কেলেঙ্কারিকে শিশুদের খেলা বানিয়ে দেবে।" এই বক্তব্যের পর বিষয়টি আর কেবল যৌনকেলেঙ্কারি ছিল না— তা পরিণত হয় জাতীয় নিরাপত্তাজনিত ঘটনার রূপে।
এর সঙ্গে সামনে আসে তাঁর রূপকথার মতো অতীত। ১৯৮২ সালে মিস ইন্ডিয়া নির্বাচিত হওয়ার পর নিউ ইয়র্কে আসা, সেখান থেকে জাপান; এরপর প্যারিসে অস্ত্র ব্যবসায়ী ও রেকর্ড প্রযোজকদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি— এবং শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ উচ্চবিত্ত সমাজে প্রবেশ। তাঁর সঙ্গী তালিকায় ছিল রাজপরিবারের সদস্য, বিল ওয়াইম্যানের মতো রকস্টার, আন্তর্জাতিক অস্ত্র ব্যবসায়ী আদনান খাশোগি এবং লন্ডনের বহু উচ্চপদস্থ সাংবাদিক।
ভারতে থাকা তাঁর ব্যক্তিগত জীবনও ছিল ট্যাবলয়েডের খাবার। দিল্লিতে বসবাসকারী তাঁর মা, শকুন্তলা চৌধুরী সংবাদমাধ্যমে জানিয়েছিলেন— তাঁর মেয়ে "পথভ্রষ্ট", এমনকি তিনি “ওকে কুকুরের চেন দিয়ে মারতেন”— এই সাক্ষাৎকারও সংবাদপ্রবাহকে আরও উত্তেজিত করে। পরবর্তীতে মা নিখোঁজ হন এবং অফিস থেকে অনির্দিষ্টকালীন ছুটিতে যান।
বন্ধু ও সহপাঠীদের মতে, পামেলা ছিলেন মেধাবী, আত্মবিশ্বাসী এবং অস্বাভাবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষী। তাঁর লক্ষ্য ছিল দ্রুত উঠতে হবে— যে পথেই হোক। ভারত থেকে মডেলিং শুরু করে আন্তর্জাতিক সামাজিক পরিমণ্ডলের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠার এই যাত্রায় তিনি কখনও সংকোচ, কখনও নৈতিকতা, কখনও সম্পর্ক— কিছুই ধরে রাখেননি।
আজও প্রশ্ন রয়ে গেছে— পামেলা কি নিছকই এক উচ্চাকাঙ্ক্ষী মহিলা, যিনি পরিস্থিতির ফাঁদে পড়েছিলেন? নাকি তিনি ছিলেন ক্ষমতার কূটকৌশলের একটি ছায়ামূর্তি— যিনি শুধু ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষাই নয়, বৃহৎ শক্তির প্রতিনিধিত্ব করতেন?
ব্রিটেনে সাময়িক ঝড় থেমে এলেও, ঘটনাটি রেখে গেল এক স্থায়ী প্রশ্ন— ক্ষমতা, যৌনতা এবং সংবাদমাধ্যমের সম্পর্ক কত সহজে একটি ব্যক্তির জীবনকে উপাদান, উত্তেজনা এবং লাভের পণ্যতে পরিণত করতে পারে।
এবং পামেলা বোর্ডেসের গল্প— এখনও তার শেষ লাইনে পৌঁছায়নি।
