আজকাল ওয়েবডেস্ক: মধ্যপ্রদেশের সাতনা জেলার আতারবেদিয়া গ্রামের কৃষক রামলোটন কুশওয়াহা। তিনি নিজের এক একরেরও বেশি জমিতে ২৫০টিরও বেশি প্রজাতির দুর্লভ ঔষধি গাছ এবং উদ্ভিদের একটি নিজস্ব "দেশি জাদুঘর" তৈরি করেছেন। প্রায় ৩০-৩৫ বছর ধরে বিলুপ্তপ্রায় ভেষজ উদ্ভিদ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করছেন। গ্রামের মানুষ রামলোটনকে 'বৈদ্য জি' বলে ডাকেন। কারণ তিনি নিজেই এই ভেষজ গাছ থেকে ওষুধ তৈরি করে রোগীদের নিরাময়ে সাহায্য করেন। এহেন কাজের জন্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁর 'মন কি বাত' অনুষ্ঠানে রামলোটন কুশওয়াহার এই প্রচেষ্টার ভূয়সী প্রশংসা করেন।
কৃষক রামলোটন কুশওয়াহাই নিজের শ্রাদ্ধানুষ্ঠান নিজেই সম্পন্ন করে ফের সংবাদ শিরোনামে। মধ্যপ্রদেশের সাতনা জেলার এই প্রগতিশীল কৃষক চিকিৎসা শিক্ষা ও গবেষণার স্বার্থে মরণোত্তর দেহদানের বিষয়ে সচেতনতা ছড়িয়ে দিতে জীবিত অবস্থাতেই নিজের শেষকৃত্য ও ‘তেরেহভি’ (ত্রয়োদশ দিনের শ্রাদ্ধ) অনুষ্ঠান সম্পন্ন করে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।
ভেষজ উদ্ভিদ সম্পর্কে অগাধ জ্ঞানের কারণে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ‘মন কি বাত’ অনুষ্ঠানে রামলোটনের নাম উচ্চারিত হয়েছিল। সেই আতারবেদিয়া গ্রামের বাসিন্দা রামলোটন কুশওয়াহা জানান, মৃত্যুর পর একটি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে নিজের দেহদান করার অঙ্গীকার তিনি আগেই করেছিলেন। দেহদানকে ঘিরে সমাজে প্রচলিত ভুল ধারণাগুলোকে চ্যালেঞ্জ জানাতেই তিনি মৃত্যুর পরবর্তী প্রথাগত আচার-অনুষ্ঠানগুলো নিজের জীবদ্দশাতেই সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত নেন।
কুশওয়াহা বলেন, "অনেকেই মনে করেন যে, শেষকৃত্যের খরচ এড়ানোর উদ্দেশ্যেই কেবল দেহদান করা হয়ে থাকে। আসলে, এই অনুষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য ছিল সমাজকে এই বার্তা দেওয়া এবং উৎসাহিত করা যে, দেহদানকে চিকিৎসা শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে একটি মহৎ অবদান হিসেবেই দেখা উচিত।"
শত শত ভেষজ উদ্ভিদ সংরক্ষণ এবং প্রথাগত পদ্ধতিতে চিকিৎসার চর্চার জন্য স্থানীয়ভাবে সুপরিচিত কুশওয়াহা জানান, তিনি চেয়েছিলেন তাঁর মৃত্যুর পরেও তাঁর দেহ যেন ভবিষ্যৎ চিকিৎসকদের জ্ঞানার্জনে সহায়তা করতে পারে। নিজের এই সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি জানান, গ্রামে ‘তেরেহভি’ অনুষ্ঠানের আয়োজন করার আগেই তিনি প্রয়াগরাজে গিয়ে নিজের ‘পিণ্ডদান’ অনুষ্ঠান সম্পন্ন করে এসেছিলেন।
রামলোটন বলেন, “ত্রয়োদশ দিনের শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের আগেই আমি এলাহাবাদে (বর্তমানে প্রয়াগরাজ) গিয়েছিলাম এবং একাদশ দিনে নিজের পিণ্ডদান অনুষ্ঠান সম্পন্ন করেছিলাম। আজ সেই ত্রয়োদশ দিনের আচার-অনুষ্ঠান পূর্ণ হল। তাই আজ ব্রাহ্মণদের ভোজন করানোর পরিবর্তে আমরা এখানে আমাদের আত্মীয়স্বজনদের আপ্যায়ন করছি। এর পেছনের কারণটিও আমি আপনাদের কাছে ব্যাখ্যা করছি। আমি আগেই একটি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে আমার দেহদান করার অঙ্গীকার করেছিলাম এবং আমার মনে হল, জীবিত অবস্থাতেই এই মহৎ কাজটি সম্পন্ন করে ফেলা উচিত। আমি যে একজন চিকিৎসক (বৈদ্য) হয়ে উঠতে পেরেছি, তার কারণ হল- আমার শিক্ষারত অবস্থায় আমি অন্য কারও কাছ থেকেই জ্ঞান অর্জন করেছিলাম, আর সেই শিক্ষাই আমাকে আজকের এই অবস্থানে পৌঁছে দিয়েছে। সেই বিষয়টি মাথায় রেখেই আমি আমার দেহদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছি, যাতে ভবিষ্যতে চিকিৎসক হওয়ার লক্ষ্যে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা আমার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ও দেহ ব্যবহার করে জ্ঞানার্জন করতে পারে।”
পরিবারের সদস্যরা রামলোটনের এই উদ্যোগকে পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছেন এবং বলেছেন যে, ভারতে দেহদানের বিষয়ে সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। রামলোচনের এক আত্মীয় বললেন, “আসলে, তিনি দেহদানের অঙ্গীকার করেছেন- যাতে তাঁর দেহটি মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের চিকিৎসা শিক্ষা ও গবেষণায় সহায়তা করতে পারে। যেহেতু তিনি একটি মেডিকেল কলেজে নিজের দেহ দান করেছেন, তাই সমাজে সচেতনতা ছড়িয়ে দিতে এবং এক নতুন চিন্তাধারার প্রসারে উৎসাহিত করতে তিনি জীবিত অবস্থাতেই নিজের ‘তেরহভি’ ও মৃত্যুবার্ষিকীর আচার-অনুষ্ঠান সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।”















