আজকাল ওয়েবডেস্ক: মুখ্য নির্বাচন কমিশনার-সহ নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের ক্ষেত্রে তিন সদস্যের কমিটিতে প্রধানমন্ত্রী, লোকসভার বিরোধী দলনেতা এবং সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতিকে রাখাই দস্তুর ছিল। কিন্তু ২০২৩ সালে ওই আইনে বদল ঘটায় কেন্দ্র। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতিকে সরিয়ে সেই জায়গায়, প্রধানমন্ত্রী, লোকসভার বিরোধী দলনেতা এবং প্রধানমন্ত্রী মনোনীত কেন্দ্রেরই এক মন্ত্রীকে রেখে নয়া আইন আনা হয়। সেই নিয়ে একাধিক জনস্বার্থ মামলা দায়ের হয় সুপ্রিম কোর্টে। মামলা করেন কংগ্রেসের জয়া ঠাকুর, অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্র্যাটিক রিফর্মসও। নয়া আইনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়।

বৃহস্পতিবার দেশের শীর্ষ আদালতে ছিল সেই মামলার শুনানি। এই শুনানিতে সুপ্রিম কোর্ট প্রশ্ন তোলে, 'সিবিআই পরিচালক নির্বাচনের কমিটিতে ভারতের প্রধান বিচারপতি অন্তর্ভুক্ত থাকলেও, দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার নির্বাচনের কমিটিতে তিনি অনুপস্থিত থাকেন। এক্ষেত্রে গণতন্ত্রের কী হবে?' 
দেশের শীর্ষ আদালত প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ প্রক্রিয়া সংক্রান্ত একটি মামলার শুনানি করছিল।

শুনানি চলাকালীন বিচারপতি দীপঙ্কর দত্ত মন্তব্য করেন, "আমি ভাবছিলাম- সিবিআই অধিকর্তা ক্ষেত্রে প্রধান বিচারপতি কমিটিতে থাকেন। আমরা বলতে পারি, আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখার স্বার্থেই হয়তো তিনি সেখানে থাকেন। অথবা এই যুক্তিকে আরও প্রসারিত করে 'আইনের শাসন' বজায় রাখার ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা যেতে পারে। কিন্তু গণতন্ত্র বজায় রাখার ক্ষেত্রে নয়? অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে নয়?"

বিচারপতি আরও প্রশ্ন তোলেন, "আমরা এমনটা বলছি না যে প্রধান বিচারপতিকেই সেখানে থাকতে হবে। কিন্তু সেখানে একজন স্বাধীন সদস্য কেন থাকবেন না? কেন সেই সদস্যকে মন্ত্রক থেকেই বেছে নিতে হবে? বিষয়টি নিয়ে আমরা অত্যন্ত স্পষ্ট হতে চাই। ধরা যাক, আজ প্রধানমন্ত্রী একজনকে বেছে নিলেন। আর বিরোধী দলনেতা বেছে নিলেন অন্য একজনকে। এই অবস্থায় যদি মতপার্থক্য দেখা দেয়, তবে তৃতীয় সদস্যটি কি বিরোধী দলনেতার পক্ষেই রায় দেবেন?"

এই প্রশ্নের জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল আর ভেঙ্কটরামানি জানান যে, তিনি এ বিষয়ে কোনও আগাম অনুমান করতে চান না। অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, "বাস্তবক্ষেত্রে হয়তো তেমনটা নাও ঘটতে পারে। আমি এ বিষয়ে কোনও আগাম অনুমান বা মন্তব্য করতে চাই না।"

বিচারপতি দীপঙ্কর দত্ত পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দেন, "তাহলে তো কার্যত শাসনবিভাগই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছে বলে ধরে নিতে হয়!"

সুপ্রিম কোর্টের বেঞ্চের পর্যবেক্ষণ, এই ধরনের নিয়োগের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তগুলো কার্যত ২:১ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতেই গৃহীত হবে। কারণ মন্ত্রিসভার কোনও সদস্যের পক্ষে প্রধানমন্ত্রীর অবস্থানের বিরোধিতা করার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ।

বিচারপতি দীপঙ্কর দত্ত বলেন, "প্রাথমিকভাবে যে বিষয়টি আমাদের ভাবিয়ে তুলছে তা হল- নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের ক্ষেত্রে শাসনবিভাগের হাতে 'ভেটো' বা বাতিলের ক্ষমতা কেন রাখা হয়েছে? এত এত নজির বা দৃষ্টান্ত থাকা সত্ত্বেও, সংসদ কি এই বিষয়গুলো সম্পর্কে অবগত ছিল না? আইন প্রণয়নের ক্ষমতা সংসদের হাতেই ন্যস্ত। কিন্তু সেই আইনের চূড়ান্ত ব্যাখ্যাকার বা মীমাংসাকারী হল সুপ্রিম কোর্ট। আপনারা পছন্দ করুন বা না করুন - আইন ব্যাখ্যা করার ক্ষমতা একমাত্র এই আদালতের হাতেই থাকবে।"

এই মামলায় এর আগে শীর্ষ আদালতে কেন্দ্র জানায়, কমিটিতে বিচার বিভাগের কেউ রইলেন কি না, তার উপর নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা নির্ভর করে না। এমনকি মামলা দায়ের হওয়ার পর পর, তড়িঘড়ি দুই নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়। যদিও কেন্দ্রীয় আইন মন্ত্রক সেই দাবি খারিজ করে দেয়।