আজকাল ওয়েবডেস্ক: সমাজকর্মী ও শিক্ষাবিদ সোনম ওয়াংচুক শুক্রবার জানিয়েছেন যে, তিনি ২০ জুলাই পর্যন্ত তাঁর অনির্দিষ্টকালের অনশন চালিয়ে যাবেন। 'ককরোচ জনতা পার্টি' (সিজেপি)-র প্রস্তাবিত সংসদ অভিযান কর্মসূচির নেতৃত্ব দেওয়ার জন্যই তাঁর এই পদক্ষেপ। তিনি আরও বলেন, এই গণ-আন্দোলন বা সমাবেশ যদি সফল না হয়, তবে তিনি "প্রেতাত্মা হয়ে ফিরে আসবেন"। শুক্রবার ওয়াংচুকের অনশন ২০তম দিনে পড়েছে। টানা ২০ দিনের অনশনে স্বাস্থ্যের অবনতি হওয়ায় সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ তাঁকে অনশন প্রত্যাহার করার অনুরোধ জানাচ্ছেন।
নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে ভাষণ দেওয়ার সময় ওয়াংচুক তাঁর সমর্থকদের বলেন, "২০ জুলাই পর্যন্ত আমি যেকোনও মূল্যে বেঁচে থাকব যাতে আপনাদের সবার সঙ্গে সংসদ অভিমুখে পদযাত্রা করতে পারি। আর ২০ জুলাই যদি আমাদের এই অভিযান সফল না হয়, তবে আমি প্রেতাত্মা হয়ে ফিরে আসব।"
শিক্ষাব্যবস্থায় অনিয়মের অভিযোগে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে ওয়াংচুক অনির্দিষ্টকালের অনশন পালন করছেন। যন্তর মন্তরে সিজেপি-র আন্দোলনের আজ ২৮তম দিন। এই আন্দোলনের পরবর্তী বড় কর্মসূচি হিসেবে ২০ জুলাইয়ের 'সংসদ চলো' বা সংসদ অভিযানকে সামনে রাখা হয়েছে। এদিকে ২০ জুলাই সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশন শুরু হবে।
যন্তর মন্তরে দেওয়া ভাষণে ওয়াংচুক তাঁর সমর্থকদের আহ্বান জানান, যেন তাঁরা বিপুল জনসমাগম নিশ্চিত করার কাজে নিজেদের শক্তি ও উদ্দীপনা কাজে লাগান। তিনি বলেন, "বাইরের দিক থেকে আমি দুর্বল হলেও ভেতর থেকে অত্যন্ত শক্তিশালী। আমি নিশ্চিত যে আপনারা সবাই ভেতর ও বাইরে- উভয় দিক থেকেই শক্তিশালী। ২০ জুলাইয়ের জন্য আমাদের এই শক্তির প্রয়োজন, যেদিন আমরা শান্তিপূর্ণভাবে সংসদ অভিমুখে পদযাত্রা করব। আমরা সবাই মিলে গণতন্ত্রের মন্দিরে গিয়ে আমাদের দাবি পেশ করব।"
২০ জুলাই সংসদ অভিমুখে পদযাত্রায় যোগ দিন: ওয়াংচুক
অনেক সমর্থক ও বিশিষ্ট ব্যক্তি সোনাম ওয়াংচুককে অনশন ভাঙার আহ্বান জানালেও, তিনি ফের বলেছেন যে- এই আন্দোলনের জন্য সহানুভূতি নয়, প্রয়োজন মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ।
এই সপ্তাহের শুরুর দিকে এক ভিডিও বার্তায় ওয়াংচুক মানুষকে অনুরোধ করেছিলেন, যেন তাঁকে অনশন ভাঙার কথা না বলে বরং সংসদ অভিমুখে পদযাত্রায় শামিল হতে বলা হয়। তিনি বলেছিলেন, "আমাকে অনশন ভাঙার কথা না বলে, দয়া করে ২০ জুলাই আমার সঙ্গে যোগ দিন... সংসদের দিকে শান্তিপূর্ণ পদযাত্রায়।"
ওয়াংচুক বরাবরই বলে আসছেন যে, নরেন্দ্র মোদি সরকারের কাছ থেকে কোনও সাড়া না পেয়ে অনশন প্রত্যাহার করলে তা ভুল বার্তা তুলে ধরবে। তিনি বারবার বলেছেন যে, ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবি অব্যাহত রাখার পাশাপাশি তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে আলোচনাও চান।
অনশনের তৃতীয় সপ্তাহে সোনম ওয়াংচুকের স্বাস্থ্যের অবনতি:
অনশন তৃতীয় সপ্তাহে গড়িয়েছে, ক্রমেই এই সমাজকর্মীর স্বাস্থ্যের আরও অবনতি হয়েছে। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, ওয়াংচুকের ওজন কমে ৫৬.৬৫ কেজিতে দাঁড়িয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় তাঁর ওজন ৫০০ গ্রাম এবং অনশন শুরুর পর থেকে ৯ কেজিরও বেশি কমেছে।
তাঁর রক্তচাপ ১০৫/৬১, রক্তে শর্করার মাত্রা ৮০ এমজি/ডিএল এবং অক্সিজেনের মাত্রা (স্যাচুরেশন) ৯৭ শতাংশ। তিনি সচেতন ও মানসিকভাবে সজাগ থাকলেও চিকিৎসকরা জানিয়েছেন যে, ওয়াংচুকের সার্বক্ষণের চিকিৎসা-পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।
ওয়াংচুকের স্বাস্থ্যের অবনতির বিষয়টি দিল্লি হাইকোর্টেরও নজরে এসেছে। আদালত কেন্দ্র ও দিল্লি সরকারকে নির্দেশ দিয়েছে যেন তারা তাঁকে প্রতিদিন পর্যবেক্ষণ করে এবং অবস্থার অবনতি হলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সহায়তা দেয় জবাবে কেন্দ্র বৃহস্পতিবার জানিয়েছে যে, তারা ওয়াংচুকের শারীরিক অবস্থার ওপর নজর রাখবে।
গত এক সপ্তাহে রাজনীতিবিদ, লেখক, অভিনেতা এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা ওয়াংচুকের প্রতি সংহতি জানাতে যন্তর মন্তরে গিয়েছেন এবং অনেকেই তাঁকে অনশন প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছেন।
ওয়াংচুকের অনশন যে পথে সিজেপি-র আন্দোলনকে গতি দিয়েছে
ওয়াংচুকের অনির্দিষ্টকালের অনশন সিজেপি-র আন্দোলনের গতিপথ আমূল বদলে দিয়েছে। আন্দোলন যখন শুরু হয়েছিল, তখন অনেকেই এটিকে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে পরিচালিত একটি ব্যঙ্গাত্মক প্রচারভিযান হিসেবে দেখেছিলেন। ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত যখন বেকার যুবকদের "আরশোলা" ও "পরজীবী" বলে অভিহিত করেন, সেই থেকে তৈরি ক্ষোভ থেকেই 'সিজেপি' -র জন্ম। সেই সময় বোস্টনে অবস্থানরত অভিজিৎ দিপকে এই ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক আন্দোলনটি শুরু করেছিলেন।
তবে ওয়াংচুকের অনশন শুরুর সিদ্ধান্ত এই প্রতিবাদকে কেবল একটি অনলাইন প্রচারণার গণ্ডি থেকে বের করে এনে এক নৈতিক ভিত্তিযুক্ত আন্দোলনে রূপ দেয়। তাঁর এই শারীরিক আত্মত্যাগ জনমতের আলোচনাকে কেবল স্লোগান ও বক্তৃতার গণ্ডি ছাড়িয়ে আরও গভীরে নিয়ে যায়। ওয়াংচুকের অনশন দুই সপ্তাহ পার করার পরই বিরোধী দলের শীর্ষস্থানীয় নেতারা প্রকাশ্যে এই আন্দোলনের বিষয়ে সাড়া দিতে শুরু করেন। লেখক, অভিনেতা এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরাও তাঁকে অনশন ভাঙার আহ্বান জানাতে থাকেন, আর সংবাদমাধ্যমের মনোযোগ ক্রমশ লাদাখের এই সমাজকর্মীর দিকে পড়ে।
বর্তমানে যারা যন্তর মন্তরে সমবেত হচ্ছেন, তাঁরা কেবল শিক্ষাব্যবস্থার ব্যর্থতার প্রতিবাদ জানাতেই আসছেন না। অনেকেই আসছেন ওয়াংচুকের পাশে দাঁড়াতে, যাঁর অনশন এখন এই আন্দোলনের মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। তবুও ওয়াংচুক জোর দিয়ে বলেন যে, কেবল সহানুভূতি দিয়ে এই আন্দোলন টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। তাঁর জন্য পরবর্তী পরীক্ষাটি অপেক্ষা করছে ২০ জুলাই।
ওয়াংচুকের মতে, কত দিন তিনি না খেয়ে থাকলেন তা নয়, বরং 'সংসদ অভিমুখে পদযাত্রা'র সাফল্যই নির্ধারণ করবে তাঁর অনশন উদ্দেশ্য অর্জনে সফল হয়েছে কি না। আর তিনি রসিকতার ছলেই সতর্ক করে দিয়েছেন যে, পদযাত্রায় অংশগ্রহণ যদি তাঁর প্রত্যাশা অনুযায়ী না হয়, তবে তিনি "ভূত হয়ে ফিরে আসবেন"।
















