আজকাল ওয়েবডেস্ক: টাটা মেমোরিয়াল সেন্টারের (টিএমসি) মতো দেশের অন্যতম শীর্ষ ক্যানসার গবেষণা প্রতিষ্ঠানের একটি সাম্প্রতিক ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালকে কেন্দ্র করে চিকিৎসাবিজ্ঞানের দুনিয়ায় শোরগোল পড়ে গেছে। ট্রায়ালটিতে দাবি করা হয়েছিল যে, পেঁপে পাতার রস বা 'কারিকা পাপায়া লিফ এক্সট্র্যাক্ট' (সিপিএলই) ক্যানসার রোগীদের কেমোথেরাপির সময় রক্তে প্লেটলেটের কাউন্ট দ্রুত বাড়াতে সাহায্য করে। কিন্তু 'জার্নাল অব ক্লিনিক্যাল অনকোলজি (জেসিও) গ্লোবাল অনকোলজি'-তে প্রকাশিত এই গবেষণাপত্রটির ওপর সাময়িকভাবে একটি 'এক্সপ্রেশন অব কনসার্ন' বা সংশয়পত্র জারি হওয়ার পরই শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। কেরলের প্রখ্যাত লিভার বিশেষজ্ঞ ও সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার ডক্টর সাইরিয়াক অ্যাবি ফিলিপস, যিনি নেটদুনিয়ায় 'লিভারডক' নামে পরিচিত, এই গবেষণার সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে জার্নাল কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানানোর পরেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
সাধারণত ডেঙ্গু বা কেমোথেরাপির কারণে রক্তে প্লেটলেটের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেলে ঐতিহ্যবাহী আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা এবং আধুনিক ফাইটোথেরাপিতে পেঁপে পাতার নির্যাস ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়। কেমোথেরাপির পর প্লেটলেট কমে যাওয়া ক্যানসার চিকিৎসায় এক বড় চ্যালেঞ্জ, যার ফলে অনেক সময় চিকিৎসকেরা কেমোর ডোজ কমাতে বা থেরাপি পিছিয়ে দিতে বাধ্য হন। গত মার্চ মাসে প্রকাশিত টিএমসি-র এই গবেষণায় প্রায় ২০০ জন রোগীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। গবেষকদের দাবি, প্লেসবো বা ডামি ওষুধের তুলনায় পেঁপে পাতার রস খাওয়া রোগীদের প্লেটলেট মাত্র ৪ দিনের মধ্যে দ্রুত পুনরুদ্ধার হয়েছে এবং মাত্র ২৫ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে কেমোর ডোজ কমানোর প্রয়োজন পড়েছে, যেখানে প্লেসবো নেওয়া রোগীদের ক্ষেত্রে এই হার ছিল ৪৩ শতাংশ। তাছাড়া মাত্র ৩০০ টাকার এই ১০ দিনের কোর্সটি ক্যানসার রোগীদের জন্য অত্যন্ত সাশ্রয়ী।
বিতর্কের সূত্রপাত হয় যখন ডক্টর ফিলিপস সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘোষণা করেন যে তাঁর অভিযোগের ভিত্তিতে জার্নালটি এই গবেষণাকে "প্রতারণামূলক" সন্দেহে স্থগিত করেছে। এটিকে টাটা মেমোরিয়ালের মতো প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি "কলঙ্কজনক অধ্যায়" বলে আখ্যা দিয়ে তিনি আয়ুষ (AYUSH) বা বিকল্প চিকিৎসা ব্যবস্থার মদদপুষ্ট এই ধরনের গবেষণাকে "লজ্জাজনক" বলে মন্তব্য করেন। তবে টাটা মেমোরিয়ালের গবেষকদের বক্তব্য, 'এক্সপ্রেশন অব কনসার্ন' কোনও চূড়ান্ত অনিয়মের প্রমাণ নয়, এটি তদন্ত চলাকালীন একটি সাময়িক প্রক্রিয়া মাত্র। গবেষণাপত্রটি এখনও প্রত্যাহার করা হয়নি।
এই গবেষণার অন্যতম সহ-লেখক এবং প্রখ্যাত ক্যানসার বিশেষজ্ঞ ডক্টর কুমার প্রভাস বিজ্ঞানভিত্তিক আলোচনার চেয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় কাদা ছোঁড়াছুড়ির এই প্রবণতা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, ২০২৩ সালে বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ক্যানসার কনফারেন্স 'অ্যাসকো' (ASCO)-তে এই গবেষণাটি মৌখিকভাবে উপস্থাপিত হয়েছিল এবং আন্তর্জাতিক স্তরে এটি সমাদৃত হয়। তাঁর মতে, আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের অনেক ওষুধই প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া উপাদান থেকে তৈরি। তাঁরা কেবল সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক নিরপেক্ষতা বজায় রেখে একটি প্রথাগত ভেষজ উপাদানকে পরীক্ষা করে দেখতে চেয়েছিলেন। ডক্টর প্রভাস চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় অপপ্রচার না করে কেউ যদি গবেষণার মাধ্যমে তাঁদের ভুল প্রমাণ করতে পারেন, তবে তাকে স্বাগত জানানো হবে।
মূল গবেষক ডক্টর বিকাশ ওসওয়ালও একটি বিবৃতিতে জানিয়েছেন যে তাঁরা তাঁদের সমস্ত ফলাফলের পক্ষে অটল রয়েছেন এবং গবেষণার সর্বোচ্চ মান বজায় রাখা হয়েছে। জার্নাল কর্তৃপক্ষ এখনও তাঁদের কাছে কোনো বৈজ্ঞানিক প্রশ্ন তোলেনি এবং তাঁরা যেকোনো পর্যালোচনার মুখোমুখি হতে প্রস্তুত। এই বিতর্কের বাইরে থাকা টাটা মেমোরিয়ালের অন্য একজন অনকোলজিস্ট নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, গবেষণার ভুলত্রুটি নিয়ে প্রশ্ন তোলা বিজ্ঞানেরই অংশ, কিন্তু বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার চালিয়ে লাইমলাইট পাওয়ার চেষ্টা করাটা অনুচিত। অ্যাসপিরিন, মরফিন বা ক্যানসারের ওষুধ প্যাক্লিটাক্সেলের মতো আধুনিক জীবনদায়ী ওষুধগুলোও যে প্রকৃতি ও উদ্ভিদ থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে তৈরি হয়েছে, তা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন যে, কেবল প্রথাগত চিকিৎসার সাথে যুক্ত বলেই কোনো গবেষণাকে ঢালাওভাবে খারিজ করে দেওয়া ঠিক নয়।
















