আজকাল ওয়েবডেস্ক: মধ্যপ্রদেশের বেতুল জেলার দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত ধাবা গ্রামটি মহারাষ্ট্র সীমান্তের খুব কাছেই। গ্রামটিতে একটি মাত্র সরকারি স্কুল রয়েছে, যা স্থানীয়দের মতে পড়াশোনার মানের দিক থেকে অত্যন্ত দুর্বল। ফলে যাঁদের আর্থিক সামর্থ্য আছে, তাঁরা সন্তানদের পাঠান গ্রাম থেকে ৮ থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরের বেসরকারি স্কুলে। অনেক ক্ষেত্রেই সেই স্কুলগুলি পড়ে অন্য রাজ্য মহারাষ্ট্রে।
এই বাস্তবতার মধ্যেই ২০২২ সালে গ্রামের বাসিন্দা আবদুল নঈম নিজের সন্তানদের পাঠাতে বাধ্য হন মহারাষ্ট্রের প্রতওয়াড়ায় একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে। ধাবা গ্রাম থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরের সেই স্কুলে সন্তানদের রেখে সপ্তাহে মাত্র একদিন তাঁদের সঙ্গে দেখা করতে পারতেন নঈম। পেশায় হার্ডওয়্যার ব্যবসায়ী নঈম জানান, সন্তানদের থেকে এত দূরে থাকতে তাঁর পক্ষে মানসিকভাবে খুব কঠিন হয়ে উঠেছিল।
দ্য ওয়্যার-এর প্রতিবেদন অনুসারে এই অভিজ্ঞতা থেকেই ২০২৪ সালে তিনি সিদ্ধান্ত নেন, নিজ গ্রামেই একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুল গড়ে তুলবেন, যাতে ভবিষ্যতে আর কাউকে এত দূরে সন্তান পাঠাতে না হয়। প্রায় ২০ লক্ষ টাকা বিনিয়োগ করে স্কুল ভবনের নির্মাণ শুরু হয়। মধ্যপ্রদেশ বোর্ডের অধীনে স্কুল চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় স্বীকৃতির আবেদনও করা হয়েছিল। নির্মীয়মাণ ভবনের কক্ষগুলিতে ‘নার্সারি’, ‘এলকেজি’, ‘ইউকেজি’- এই ধরনের সাইনবোর্ডও লাগানো ছিল।
&t=2sকিন্তু ২০২৬ সালের ১৩ জানুয়ারি সকালে হঠাৎ করেই পরিস্থিতি বদলে যায়। পঞ্চায়েত সচিব পবন তিওয়ারি, একটি বুলডোজার, কয়েকজন পুলিশকর্মী এবং বেতুলের সাব-ডিভিশনাল ম্যাজিস্ট্রেট অজিত মেরাভি গ্রামের ওই স্কুল ভবনে এসে হাজির হন। কোনও স্পষ্ট পূর্ব নোটিস ছাড়াই ভবনের একটি অংশ ভেঙে ফেলা হয়।
পরবর্তীতে জেলা কালেক্টর নরেন্দ্র কুমার সূর্যবংশী একটি স্থানীয় ইউটিউব চ্যানেলে দাবি করেন, ভাঙচুর পঞ্চায়েতের নির্দেশেই হয়েছে এবং পুলিশ শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য উপস্থিত ছিল। তবে ভাঙচুর চলাকালীন তোলা ভিডিও ফুটেজ সেই দাবিকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। ভিডিওতে দেখা যায়, নির্বাচিত সরপঞ্চ রামরতি দেবী এসডিএম-কে অনুরোধ করছেন যেন ভাঙচুর বন্ধ করা হয় এবং নঈমকে পরে নিয়ম মেনে কাজ শেষ করার সুযোগ দেওয়া হয়। কিন্তু সেই অনুরোধ উপেক্ষা করেই ভাঙচুর চালানো হয়, যেখানে পঞ্চায়েত সচিবকে সক্রিয়ভাবে সমর্থন করতে দেখা যায়।
ভিডিওতে এক গ্রামবাসী প্রশাসনের কাছে সরাসরি প্রশ্ন তোলেন—এই গ্রামে এমন কোনও নির্মাণ দেখানো যাবে কি, যেখানে নির্মাণের আগে পঞ্চায়েতের এনওসি নেওয়া হয়েছিল? তিনি গ্রামে একাধিক নির্মাণের উদাহরণ দেন, যেগুলির ক্ষেত্রেও কোনও এনওসি নেওয়া হয়নি বলে দাবি করা হয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই প্রশ্নগুলির কোনো উত্তর দেওয়া হয়নি।
গ্রামবাসীদের আরও অভিযোগ, পঞ্চায়েত সচিব পবন তিওয়ারির ভাই গ্রাম থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে একটি বেসরকারি স্কুল চালান, যেখানে ধাবা গ্রামের বহু শিশু পড়াশোনা করে। নঈমের স্কুল চালু হলে সেই স্কুলের উপর প্রভাব পড়তে পারত বলে অভিযোগ। নঈমের কাকা মোবিন খান ভিডিওতে দাবি করেন, ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে এই ভাঙচুর করা হয়েছে এবং সচিব নিজের ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। এই অভিযোগও ঘটনাস্থলে উপেক্ষিত থাকে।
এই ঘটনার আগে গ্রামে একটি গুজব ছড়িয়ে দেওয়া হয় যে, নঈম নাকি স্কুলের আড়ালে একটি মাদ্রাসা তৈরি করতে চাইছেন। গ্রামবাসীদের দাবি, এই গুজব উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ছড়ানো হয়। সরপঞ্চের স্বামী মদন কানগালে বলেন, এসডিএম ১০ জানুয়ারি গ্রামে এসে মাদ্রাসার প্রসঙ্গ তুলেছিলেন, যদিও এমন কোনও পরিকল্পনাই ছিল না। নঈম নিজেও স্পষ্ট করে জানান, তিনি কোনও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত নন এবং কীভাবে এই গুজব ছড়াল, তা তিনি বুঝতে পারছেন না।
গ্রামের বাসিন্দা কপিল কাওড়ে বলেন, সবাই জানতেন সেখানে একটি স্কুলই তৈরি হবে। তাঁর কথায়, “আবদুল নঈমের নামটাই তাঁর জন্য ক্ষতিকর হয়ে গেল। এই গ্রামে কোনও অমুসলিমকে নির্মাণের আগে এনওসি নিতে আমি কখনও দেখিনি।” আরেক গ্রামবাসী হেমন্ত কাওড়ে বলেন, এমনকি মাদ্রাসা হলেও তা বেআইনি নয়। তিনি অভিযোগ করেন, গ্রামে আরএসএস পরিচালিত একটি হোস্টেল থাকলেও তার বিরুদ্ধে কোনও আপত্তি ওঠে না।
আইনি দিক থেকে প্রশাসন মধ্যপ্রদেশ পঞ্চায়েত রাজ ও গ্রাম স্বরাজ অধিনিয়ম, ১৯৯৩-এর ৫৫ ধারার কথা উল্লেখ করছে, যেখানে নির্মাণের আগে পঞ্চায়েতের এনওসি বাধ্যতামূলক। তবে গ্রামবাসীদের দাবি, এই আইন তাঁদের জীবনে প্রথমবার কার্যকর হতে দেখছেন, তাও একমাত্র আবদুল নঈমের ক্ষেত্রেই।
আরও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশিকা লঙ্ঘনের। আদালতের স্পষ্ট নির্দেশ অনুযায়ী, যেকোনও ভাঙচুরের আগে অন্তত ১৫ দিনের লিখিত নোটিস দিতে হয় এবং তা সংশ্লিষ্ট ভবনে টাঙানো বাধ্যতামূলক। নঈমের দাবি, তিনি কোনও নোটিস পাননি এবং ভবনেও কোনও নোটিস টাঙানো ছিল না। যদিও ভিডিওতে পঞ্চায়েত সচিব দাবি করেন যে দু’দিন আগে নোটিস দেওয়া হয়েছিল, তাতেও সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ লঙ্ঘিত হয়।
নঈম জানান, তিনি ও অন্যান্য গ্রামবাসী যখন কালেক্টরের দপ্তরে গিয়ে ভাঙচুর বন্ধের আবেদন জানাচ্ছিলেন, সেই সময়েই তাঁর স্কুলের অংশবিশেষ ভেঙে ফেলা হয়। বর্তমানে তিনি বেতুল আদালতে মামলা করেছেন এবং ভাঙচুরে স্থগিতাদেশ চেয়েছেন।
নঈম বলেন, তিনি কারও বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা চান না, ক্ষতিপূরণও নয়। তাঁর একমাত্র দাবি—স্কুলটি নির্মাণের অনুমতি দেওয়া হোক। এনওসি না নেওয়ার জন্য জরিমানা দিতে তিনি প্রস্তুত। কথা বলতে বলতে তাঁর গলা ভারী হয়ে আসে। তিনি বলেন, “পবন আমার খুব পরিচিত ছিল। বড় ভাইয়ের মতো ছিল। আজও বুঝতে পারছি না, কেন সে এটা করল।”
ধাবা গ্রামের এই ঘটনাকে ঘিরে এখন একটাই প্রশ্ন বারবার উঠে আসছে—আইন কি সত্যিই সবার জন্য সমান, নাকি পরিচয় আর ক্ষমতার ভিত্তিতেই তার প্রয়োগ হয়? গ্রামে ভাঙা দেওয়ালের পাশে দাঁড়িয়ে সেই প্রশ্নই আজ সবচেয়ে জোরালো।
