আজকাল ওয়েবডেস্ক: রাজস্থানের পুষ্কর। যেখানে বাতাসে ভাসে ধূপের সুবাস, আর চারপাশ থেকে ভেসে আসে মন্দিরের ঘণ্টার ধ্বনি। পবিত্র হ্রদের ঘাটে যখন পুণ্যার্থীরা ভিড় জমিয়েছেন, ঠিক তখনই কিছুটা দূরে এক অদ্ভুত, প্রায় অবিশ্বাস্য দৃশ্য চাক্ষুষ করলেন স্থানীয় মানুষ। চারদিকে গনগনে আগুনের লেলিহান শিখা, আর তার ঠিক মাঝখানে বসে আছেন এক রমণী। চোখ বন্ধ, শরীর অনড়, মুখে গভীর প্রশান্তি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেল, তিনি কোনও সাধারণ সাধিকা নন। সুদূর রাশিয়া থেকে আধ্যাত্মিকতার টানে ভারতে চলে আসা এক যোগিনী—অন্নপূর্ণা নাথ। গত ৩ মে থেকে শুরু হওয়া এই অগ্নি-সাধনা চলবে আগামী ২৫ মে পর্যন্ত। প্রখর গ্রীষ্মের তপ্ত দুপুরে যখন সাধারণ মানুষের বাইরে বেরোনো দায়, তখন ৯টি জ্বলন্ত ধুনির (পবিত্র অগ্নিকুণ্ড) মাঝে বসে দিনের পর দিন গভীর ধ্যানে মগ্ন রয়েছেন তিনি। যোগশাস্ত্রে একে বলা হয় "ধূনি অগ্নি তপস্যা"।
বাহ্যিক দৃষ্টিতে একে চরম পাগলামি বা অলৌকিক ভেলকি মনে হতে পারে, কিন্তু সনাতন ও যোগ ঐতিহ্যে এই সাধনার স্থান অনেক উচ্চে। সংস্কৃতে ‘তপস’ শব্দের অর্থ হল ‘দহন’ বা ‘তাপ উৎপন্ন করা’। এই তপস্যা কোনও আত্মপীড়ন নয়, বরং নিজের ভেতরের অহংকার, নেতিবাচকতা এবং অতীত কর্মের আসক্তিকে পুড়িয়ে খাঁটি সোনায় রূপান্তরিত করার এক প্রাচীন প্রক্রিয়া। যেমনটা আকরিক লোহাকে চুল্লিতে গলিয়ে বিশুদ্ধ করা হয়।
সাধারণত সাধু-সন্ন্যাসীরা পাঁচটি অগ্নিকুণ্ড জ্বালিয়ে "পঞ্চ ধূনি" তপস্যা করেন। কিন্তু অন্নপূর্ণা নাথ বেছে নিয়েছেন আরও কঠিন পথ—নয়টি অগ্নিকুণ্ডের "নব-ধূনি"। যোগশাস্ত্রে ‘নয়’ সংখ্যাটিকে পূর্ণতা এবং সমগ্রতার প্রতীক ধরা হয়। এই নয়টি আগুনের বৃত্ত একদিকে যেমন তীব্র তাপের সৃষ্টি করে, অন্যদিকে সাধককে বাধ্য করে গভীরতম একাগ্রতায় পৌঁছাতে। কারণ, আগুনের মাঝে বসে মনকে সামান্যতম বিচলিত হতে দিলেই বিপদ।
অনেকেই হয়তো ভাবছেন, এটি কোনও চমক তৈরির চেষ্টা। কিন্তু স্থানীয় যোগী মহলের দাবি, অন্নপূর্ণা নাথ হুট করে একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে এই সিদ্ধান্ত নেননি। এর পেছনে রয়েছে বছরের পর বছর ধরে করা কঠোর মানসিক ও শারীরিক প্রস্তুতি। প্রাচীন ‘যোগ সূত্র’ বা ‘তান্ত্রিক সাহিত্য’-এ বর্ণিত কঠোর নিয়ম মেনেই তিনি এই দীক্ষা নিয়েছেন। হিন্দু পুরাণেও এমন তপস্যার অজস্র উল্লেখ রয়েছে। মহাভারতের অর্জুন যেমন পাশুপত অস্ত্র লাভের জন্য এক পায়ে দাঁড়িয়ে প্রখর সূর্যের দিকে চেয়ে তপস্যা করেছিলেন, কিংবা বিংশ শতাব্দীর শিববালাযোগী যেভাবে টানা ১২ বছর ধ্যান করেছিলেন—অন্নপূর্ণার এই সাধনা সেই প্রাচীন ঐতিহ্যেরই এক আধুনিক প্রতিফলন।
পুষ্করের এই তীব্র গরম, ধোঁয়া আর লেলিহান শিখার মাঝে বসে এই রুশ যোগিনী আসলে কী খুঁজছেন? শুধুই কি বিশ্বশান্তি, নাকি নিজের অস্তিত্বকে পুড়িয়ে পরমাত্মার সঙ্গে একাত্ম হওয়া? উত্তরটা হয়তো তাঁর বন্ধ চোখের অন্তরালেই রয়ে গেছে। তবে হাজার বছরের প্রাচীন ভারতীয় আধ্যাত্মিকতার যে শক্তি আজও মানুষকে দূর দেশ থেকে টেনে আনে, পুষ্করের এই অগ্নিকুণ্ড যেন তারই জীবন্ত প্রমাণ।















