আজকাল ওয়েবডেস্ক: মহারাষ্ট্র নবনির্মাণ সেনা (এমএনএস) প্রধান রাজ ঠাকরের কড়া ও বিতর্কিত মন্তব্যকে কেন্দ্র করে রবিবার মুম্বইয়ের রাজনৈতিক মঞ্চে তীব্র উত্তাপ ছড়াল। উত্তরপ্রদেশ ও বিহার থেকে আগত পরিযায়ী শ্রমিকদের উদ্দেশ্যে হিন্দি ভাষার “আরোপ” নিয়ে প্রকাশ্য হুঁশিয়ারি দেন রাজ ঠাকরে। সেই সঙ্গে, বহু বছর পর এক মঞ্চে এসে শিবসেনা (উদ্ধব বালাসাহেব ঠাকরে) প্রধান উদ্ধব ঠাকরের সঙ্গে তিনি স্পষ্ট বার্তা দেন আসন্ন বৃহন্মুম্বই মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন (বিএমসি) নির্বাচন মারাঠি পরিচয়ের “শেষ লড়াই”।

যুগ্ম জনসভায় রাজ ঠাকরে বলেন, “উত্তরপ্রদেশ ও বিহারের মানুষদের বুঝতে হবে হিন্দি তোমাদের ভাষা, আমাদের নয়। আমি ভাষাকে ঘৃণা করি না। কিন্তু যদি তা আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে আমি লাথি মারব।” এই মন্তব্যের সঙ্গে সঙ্গেই সভাস্থলে উপস্থিত কর্মী-সমর্থকদের উচ্ছ্বসিত সাড়া শোনা যায়।

বিএমসি নির্বাচনকে শুধুমাত্র পুরসভার ক্ষমতা দখলের লড়াই হিসেবে না দেখে, রাজ একে মারাঠি অস্তিত্বের প্রশ্ন হিসেবে তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য, “চারদিক থেকে লোক এসে মহারাষ্ট্রে ঢুকছে, তোমাদের অংশ কেড়ে নিচ্ছে। যদি জমি আর ভাষা দুটোই চলে যায়, তাহলে তোমরাও শেষ হয়ে যাবে।” তিনি আরও বলেন, “এটাই মারাঠি মানুষের শেষ নির্বাচন। আজ যদি সুযোগ হাতছাড়া করো, ভবিষ্যৎ থাকবে না।”

মুম্বইকে মহারাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত করার জন্য যে ঐতিহাসিক আন্দোলন ও আত্মত্যাগ হয়েছে, তার প্রসঙ্গ টেনে রাজ প্রশ্ন তোলেন, “যাঁরা রক্ত দিয়েছেন, তাঁদের আমরা কী জবাব দেব?”

পোলিং ডে ঘিরে দলীয় কর্মীদের উদ্দেশ্যে কড়া নির্দেশও দেন এমএনএস প্রধান। সকাল ছ’টায় বুথ লেভেল এজেন্টদের প্রস্তুত থাকার কথা বলে তিনি বলেন, ইভিএম এবং সম্ভাব্য ‘ডাবল ভোটার’-দের উপর কড়া নজর রাখতে হবে। তাঁর কথায়, “কেউ দ্বিতীয়বার ভোট দিতে এলে তাকে বের করে দাও।”

অন্যদিকে, উদ্ধব ঠাকরে জানান, রাজনৈতিক পরিস্থিতিই তাঁদের এই ফের এক মুছে আসতে  বাধ্য করেছে। বহুদিন পর একসঙ্গে মঞ্চে এসে তিনি বলেন, “মুম্বই আজ অস্তিত্ব সংকটে। মারাঠি মানুষ, হিন্দু এবং মহারাষ্ট্রের স্বার্থে আমাদের ব্যক্তিগত বিভেদ সরিয়ে রাখতে হয়েছে।”
উদ্ধবের মন্তব্য, “একজন মারাঠির রক্তে ভালোবাসা থাকতে হয়।”

দু’জনেই বিজেপির বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানান। রাজ ঠাকরে তিন ভাষা নীতি এবং প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত হিন্দি বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাবকে বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের অংশ বলে দাবি করেন। তাঁর মতে, এটি পরীক্ষা করা হচ্ছে মারাঠি মানুষ “সচেতন আছে কি না”।

অর্থনৈতিক ইস্যুতেও বিজেপিকে কাঠগড়ায় তোলেন রাজ। তাঁর অভিযোগ, ২০১৪ সালে কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসার পর বিজেপি ধারাবাহিকভাবে আদানি গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করে চলেছে। পালঘর, থানে এবং মুম্বই মেট্রোপলিটন রিজিয়নের ওপর নিয়ন্ত্রণ কায়েম করে গুজরাটের সঙ্গে মুম্বইকে যুক্ত করার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা তিনি উত্থাপন করেন। ভাধাভান বন্দরের প্রসঙ্গ টেনে রাজ বলেন, “বিএমসি আমাদের হাতে থাকলে তারা আদানির হাতে জমি তুলে দিতে পারবে না।”

উদ্ধব ঠাকরে বিজেপির বিরুদ্ধে ‘ভুয়ো হিন্দুত্ব’-এর অভিযোগ তোলেন। তিনি বলেন, “একটা নির্বাচন দেখান যেখানে আপনারা হিন্দু-মুসলমান রাজনীতি খেলেননি।” তিনি তামিলনাড়ু বিজেপি নেতা কে. আন্নামালাইয়ের মন্তব্যেরও তীব্র সমালোচনা করেন, যেখানে বলা হয়েছিল মোদি, ফড়নবিস এবং বিজেপি মেয়র থাকলে ‘বম্বে মহারাষ্ট্রের শহর নয়, আন্তর্জাতিক শহর’। উদ্ধব প্রশ্ন তোলেন, তাহলে কি বিজেপি আবার মুম্বইয়ের নাম বদলে ‘বম্বে’ করতে চায়?

বিএমসি-তে আগের শিবসেনা-বিজেপি জোট সরকারের সময় প্রায় তিন লক্ষ কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগও করেন উদ্ধব। তাঁর দাবি, পরিকাঠামো প্রকল্পে ব্যবহৃত সিমেন্টের বড় অংশই আদানি গোষ্ঠী থেকে নেওয়া হয়েছে।

সব মিলিয়ে, এই যুগল জনসভা স্পষ্ট করে দিল আসন্ন বিএমসি নির্বাচন শুধুই নাগরিক পরিষেবা বা প্রশাসনিক ক্ষমতার লড়াই নয়। মারাঠি ভাষা, সংস্কৃতি, অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ এবং মুম্বইয়ের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশ সবকিছু মিলিয়ে এটি এক গভীর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংঘাতের রূপ নিচ্ছে।