আজকাল ওয়েবডেস্ক: লাদাখে ২০২০ সালের চিনা আগ্রাসন ও সেই সময় ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়ে সংসদে নতুন করে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিলেন বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী। বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) লোকসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি প্রাক্তন সেনাপ্রধান জেনারেল এম এম নরবণে-র এখনও অপ্রকাশিত স্মৃতিকথা Four Stars of Destiny প্রসঙ্গ তোলেন। সংসদের ভিতরে ওই বইয়ের উদ্ধৃতি দিতে তাঁকে বাধা দেওয়া হলে, সংসদের বাইরে সাংবাদিকদের সামনে বইটি হাতে তুলে ধরে তিনি বলেন, “ওরা বলছে এই বইয়ের অস্তিত্ব নেই। কিন্তু এই বই আছে, এবং দেশের প্রতিটি তরুণের জানা উচিত এতে কী লেখা রয়েছে।”
রাহুল গান্ধীর দাবি, নরবণে তাঁর স্মৃতিকথায় লাদাখে চিনা সেনার অগ্রগতির সময়কার সম্পূর্ণ পরিস্থিতির বিবরণ দিয়েছেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, ২০২০ সালে সংকটের সময়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সেনাপ্রধানকে যে বার্তা দিয়েছিলেন—“Jo uchit samjho woh karo” (যা ঠিক মনে হয়, তাই করো)। রাহুলের বক্তব্য অনুযায়ী, এই মন্তব্য আসলে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়। তাঁর ভাষায়, “এর মানে দাঁড়ায় প্রধানমন্ত্রী বলছেন—এটা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। একজন সেনাপ্রধানকে এমন গুরুতর জাতীয় সঙ্কটে একা ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল।”
সোমবার লোকসভায় প্রথম এই প্রসঙ্গ তুলতেই ট্রেজারি বেঞ্চে প্রবল হট্টগোল শুরু হয়। প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ আপত্তি জানিয়ে বলেন, কোনও অপ্রকাশিত বই বা তার ওপর ভিত্তি করে লেখা প্রবন্ধ সংসদে উদ্ধৃত করা যায় না। লোকসভার অধ্যক্ষ ওম বিড়লা সংসদের নিয়ম ৩৪৯ উদ্ধৃত করে রাহুলকে Caravan পত্রিকায় প্রকাশিত একটি প্রবন্ধ উল্লেখ করতে নিষেধ করেন, যেখানে নরবণে-র স্মৃতিকথা থেকে একাধিক অংশ তুলে ধরা হয়েছে।
&t=2sCaravan-এর ফেব্রুয়ারি সংখ্যায় প্রকাশিত ওই লেখায় দাবি করা হয়েছে, নরবণে লিখেছেন যে লাদাখ সঙ্কটের সময়ে তাঁকে কার্যত একটি “হট পটেটো” হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল—অর্থাৎ চিনা আগ্রাসনের মোকাবিলার সম্পূর্ণ দায় তাঁর কাঁধেই চাপিয়ে দেওয়া হয়। রাহুল গান্ধী বলেন, নরবণে নিজেই লিখেছেন যে এই পরিস্থিতিতে তিনি নিজেকে “একেবারে একা এবং গোটা রাষ্ট্রযন্ত্রের দ্বারা পরিত্যক্ত” বলে মনে করেছিলেন।
মঙ্গলবার সংসদের ভিতরে বক্তব্য রাখতে গিয়ে রাহুল আরও জানান, চিনা ট্যাঙ্ক ভারতের ভূখণ্ডে কাইলাস রেঞ্জে পৌঁছে গেলে সেনাপ্রধান প্রথমে প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংকে ফোন করেন, কিন্তু কোনও উত্তর পাননি। এরপর বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং ফের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোনও দিকনির্দেশ মেলেনি। পরে রাজনাথ সিং জানান যে তিনি ‘উপর মহলে’ কথা বলবেন। রাহুলের দাবি অনুযায়ী, তখনই জানানো হয় যে চিনা সেনা ঢুকে পড়লেও অনুমতি ছাড়া গুলি চালানো যাবে না। সেনাবাহিনী যদিও চেয়েছিল ট্যাঙ্কগুলির বিরুদ্ধে গুলি চালাতে, কারণ সেগুলি ভারতের ভূখণ্ডে প্রবেশ করেছিল।
রাহুল গান্ধীর অভিযোগ, এই গোটা ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট সিদ্ধান্ত না নিয়ে সেনাপ্রধানের উপরেই দায় চাপিয়ে দেন। তিনি বলেন, “এই কথাগুলো সংসদে উচ্চারিত হোক, এটাই ওদের ভয়।” তাঁর আরও দাবি, প্রধানমন্ত্রী আজ রাষ্ট্রপতির ভাষণের উপর ধন্যবাদ জ্ঞাপন প্রস্তাবের জবাব দিতে লোকসভায় আসলে তিনি নিজে গিয়ে নরবণে-র বইটি তাঁর হাতে তুলে দেবেন, যাতে দেশবাসী সত্য জানতে পারে।
রাহুলের বক্তব্যে বারবার বাধা দেওয়ার প্রতিবাদে মঙ্গলবার সংসদে বিক্ষোভ শুরু হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে স্পিকার আটজন বিরোধী সাংসদকে সাময়িকভাবে সাসপেন্ড করেন।
উল্লেখ্য, চলতি বছরের জানুয়ারিতে The Wire জানিয়েছিল যে জেনারেল নরবণে-র স্মৃতিকথা Four Stars of Destiny এখনও প্রতিরক্ষা ও বিদেশ মন্ত্রকের ছাড়পত্রের অপেক্ষায় রয়েছে। বইটির প্রকাশের নির্দিষ্ট দিন এখনও জানা যায়নি। এই অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে—জাতীয় নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সেনাপ্রধানের অভিজ্ঞতা প্রকাশ্যে আসতে দেরি কেন, এবং সেই অভিজ্ঞতার দায় রাজনৈতিক নেতৃত্ব কীভাবে নেবে?
