আজকাল ওয়েবডেস্ক: ছত্তীসগঢ়ের সুরজপুর জেলায় একটি রুটি তৈরির কারখানায় কাজ করা পশ্চিমবঙ্গের আটজন পরিযায়ী শ্রমিককে মারধর করে তাড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বজরং দলের সদস্যদের বিরুদ্ধে। আক্রান্ত শ্রমিকরা সকলেই পুরুলিয়ার জঙ্গলমহলের চেপরি গ্রামের বাসিন্দা। ন্যায্য মজুরি চাওয়াকেই এই হামলার মূল কারণ বলে জানিয়েছেন তাঁরা।

ঘটনাটি ঘটেছে গত ৪ জানুয়ারি, সুরজপুর জেলার পাত্রাপাড়া এলাকার জয়দুর্গা বেকারিতে। হামলার পর চারজন শ্রমিক শেখ জসিম, শেখ আসলাম, শেখ বাবি ও শেখ জুলফুকার কোনওমতে বাড়ি ফিরতে পারলেও বাকি চারজন, শেখ ইসমাইল, শেখ মিনার, আরবাজ কাজি ও শেখ সাহিল (যাঁরা সবাই নাবালক), এখনও সুরজপুরের একটি সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রে রয়েছেন। পুরুলিয়া জেলা প্রশাসন তাঁদের দ্রুত পরিবারের কাছে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে।

হামলার ঘটনার পর চেপরি গ্রামে আতঙ্কের ছায়া নেমে এসেছে। প্রায় ৩০০ মুসলিম পরিবার বসবাস করে এই গ্রামে, যার অধিকাংশ পরিবারই জীবিকার তাগিদে ভিন্‌রাজ্যে কাজ করতে বাধ্য। সাম্প্রতিক সময়ে ওড়িশা, দিল্লি, রাজস্থান ও হরিয়ানায় বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকদের উপর হামলার ঘটনার প্রেক্ষিতে শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠছে।

গ্রামবাসী শেখ নজিরউদ্দিন জানান, “আমাদের গ্রামে অধিকাংশ মানুষের নিজের জমি নেই। যাঁদের সামান্য জমি আছে, তাতেও সংসার চলে না। তাই গত ১৫ বছর ধরে প্রায় প্রতিটি পরিবার থেকেই যুবক ও মধ্যবয়সি পুরুষরা ভিন্‌রাজ্যে কাজে যান। গত চার বছরে এই প্রবণতা আরও বেড়েছে।”

শেখ আবু তালিমের কথায়, চেপরি গ্রামের শ্রমিকরা মূলত দেশের বিভিন্ন প্রান্তের রুটি ও বেকারির কারখানায় কাজ পান।

আক্রান্ত শ্রমিক শেখ জসিম জানান, তিনি তিন মাস আগে ওই বেকারিতে কাজ শুরু করেন। শীতকালে উৎপাদন বাড়ায় মালিক রাকেশ জিন্দাল আরও সাতজন শ্রমিক আনার কথা বলেন। সেই নির্দেশ মেনেই তিনি গ্রাম থেকে বাকিদের নিয়ে যান। প্রতিদিন প্রায় তিন কুইন্টাল ময়দা প্রক্রিয়াকরণ হতো বলে জানান তিনি দ্যা ওয়্যার-কে।

কিন্তু ২৫ ডিসেম্বরের পর উৎপাদন কিছুটা কমতেই মালিক শ্রমিকদের আর রাখতে চাননি। মাসে ৭ থেকে ১০ হাজার টাকা মজুরি পাওয়ার কথা থাকলেও প্রতিশ্রুত টাকা দেওয়া হচ্ছিল না। ন্যায্য মজুরি চাইতেই পরিস্থিতি ঘোরালো হয়।

শ্রমিকদের অভিযোগ, ৪ জানুয়ারি রবিবার দুপুরে মালিকের উপস্থিতিতেই বজরং দলের লোকজন কারখানায় ঢুকে প্রথমে তাঁদের মোবাইল ফোন কেড়ে নেয়, তারপর ‘জয় শ্রী রাম’ স্লোগান দিতে দিতে মারধর শুরু করে। “আমাদের বাংলাদেশি বলে দাগানো হয়। আধার কার্ড দেখিয়েও কোনও লাভ হয়নি,” বলেন শেখ জসিম। মারধরের সময় মালিক নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেন বলেও অভিযোগ।

শ্রমিকদের দাবি, পুলিশ ঘটনাস্থলে এলেও প্রথমে কোনও হস্তক্ষেপ করেনি। পরে আটজনকেই উদ্ধার করে সুরজপুর থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। বকেয়া মজুরিও এখনও মেটানো হয়নি। হামলার স্মৃতি এখনও তাড়া করে বেড়াচ্ছে শ্রমিকদের। তাঁরা জানিয়েছেন, আর ভিন্‌রাজ্যে কাজে যাওয়ার সাহস পাচ্ছেন না। কিন্তু গ্রামেও কাজ নেই। ফলে আটটি পরিবার চরম আর্থিক সংকটে পড়েছে।

পশ্চিমবঙ্গ পরিযায়ী শ্রমিক ইউনিয়নের সহ-সম্পাদক উজ্জ্বল সরকার বলেন, “একদিকে ভাষার কারণে হামলা, অন্যদিকে বাড়ি ফিরে কাজের অভাব এই দ্বিমুখী সংকটে পরিযায়ী শ্রমিকদের পরিবার মানসিক ও আর্থিকভাবে ভেঙে পড়ছে।” সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা চার শ্রমিকের সবাই ১৬ বছরের নিচে। ১৪ বছরের শেখ সাহিলের বিধবা মা সাবিনা বিবি বলেন, “ছেলেটা সংসারের জন্য কাজে গিয়েছিল। এখন মার খেয়ে ওখানে আটকে আছে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ওদের বাড়ি ফেরানো হোক।”

পুরুলিয়ার পুলিশ সুপার বৈভব তিওয়ারি জানিয়েছেন, বাকি চার শ্রমিককে দ্রুত ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। এই ঘটনার পর চেপরি গ্রাম শুধু আতঙ্কিত নয়, গভীর অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়ে যেখানে কাজ ছাড়া বাঁচা যায় না, আবার কাজ করতে গেলেই প্রাণের ভয়।