২৯ মার্চ 'ভোলে বাবা পার করেগা' ধারাবাহিকের শুটিং করতে গিয়ে সমুদ্রে তলিয়ে মৃত্যু হয় রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের। সেদিন ওই দুর্ঘটনাস্থলে রাহুলের সঙ্গে শট দিয়েছেন যে অভিনেতারা তাঁদের অন্যতম হলেন অম্বরীশ ভট্টাচার্য। যদিও অভিনেতা দুর্ঘটনার কবলে পড়ার আগেই প্যাক আপ হয়ে গিয়েছিল তাঁর পর্দার 'বাবা' অর্থাৎ অম্বরীশের। কিন্তু রাহুলের মৃত্যুর পর তাঁর শেষকৃত্য থেকে টলিউডের মিটিং, মিছিল কোথাও দেখা যায়নি অম্বরীশকে। কেন? অবশেষে এক সপ্তাহ পর মুখ খুললেন তিনি।
আজকাল ডট ইনকে রাহুলের মৃত্যু প্রসঙ্গে অম্বরীশ ভট্টাচার্য বলেন, "আমাদের দুপুর তিনটেয় প্যাক আপ হয়ে যায়। শুধু নায়ক, আর নায়িকার সিন ছিল। রাহুলের সঙ্গে আমরা শেষ শট দিই আড়াইটে, পৌনে তিনটে নাগাদ। আমরা এরপর কলকাতার দিকে রওনা দিই। অনেকটা এগিয়ে আসি তখন খবরটা আসে। খবরটা শুনে অবিশ্বাস্য লেগেছিল। বিষয়টা আমার কাছে আরও বেশি শকিং কারণ গত দুই মাস ধরে আমি আর ও একই ঘরে বসতাম। যাওয়ার আগের দিনও আমায় একটা বই উপহার দিয়েছে।"
কেন সেই ঘটনার পর তাঁকে কোথাও দেখা যায়নি আর? তবে কি তিনি নিজের পিঠ বাঁচিয়ে চলছেন? এমনই জল্পনা সমাজমাধ্যমে। এই বিষয়ে অম্বরীশ ভট্টাচার্যর জবাব, "দর্শকদের মধ্যে একটা ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়েছে দেখলাম যে আমি কেন কোথাও যাচ্ছি না। আমার পক্ষে একদিনের মাথায় ওর শবদেহ দেখতে যাওয়া সম্ভব ছিল না। তাতে যদি কেউ আমায় দোষী মনে করেন, সংবেদনশীল নই মনে করেন তাতে আমার সত্যিই কিছু করার নেই। ওখানে গেলে একটা সিন ক্রিয়েট হতো, আমি অসুস্থ হয়ে পড়তাম। সেই জন্য যেতে পারিনি।"
তবে রাহুলের শেষকৃত্যে না গেলেও এই ঘটনার প্রতিবাদ নিজের মতো করে জানিয়েছেন অম্বরীশ। তিনি এদিন বলেন, "আমি ফিরে আসার দু'দিনের মধ্যে ম্যাজিক মোমেন্টসে চিঠি দিয়ে জানিয়ে দিয়েছি আমি আর ওদের কোনও ধারাবাহিকে কাজ করব না। এটা হয়তো দর্শক জানে না। কিন্তু সবার জানা দরকার। দর্শকের ভালবাসায় আজ আমি, আমি হয়েছি। তাঁদের কাছে আমি জবাবদিহি করতে বাধ্য।" তাঁর আরও সংযোজন, "ওই পরিবেশে আমি আর যেতে পারব না। 'চিরসখা' ধারাবাহিকও তো কাজ করতাম ওদের, সেটাও আর করব না। মঙ্গলবার, বুধবারের মধ্যেই ওটা ওদের জানিয়ে দিয়েছি। ওরা আমার সিদ্ধান্তকে সম্মান করেছেন, কোনও যোগাযোগ করেননি। এটা মানুষের জানা দরকার। অনেকে ভাবছেন আমি চুপ করে আছি। সেটা নয়। আমার পক্ষ থেকে এটা আমি করেছি। যতক্ষণ না সেফটি মেসার তৈরি হচ্ছে ততক্ষণ কাজ করা সম্ভব নয়। সমাজমাধ্যমে এটা ফলাও করে জানানোর প্রয়োজন বোধ করিনি। বন্ধুরা জানাল, দর্শক মনে করছেন আমি পিঠ বাঁচিয়ে চলছি। আমি জানি না পিঠ বাঁচিয়ে চলার মানে কী। আমরা সবাই চাই দোষীরা শাস্তি পাক। সকলে চাই এই পরিস্থিতি বদলাক। FIR করার পর, পুলিশ-প্রশাসন যেটা দেখছে সেখানে আর কী বলার আছে।"
রাহুলের মৃত্যুর পর ম্যাজিক মোমেন্টসের তরফে এবং লীনা গঙ্গোপাধ্যায় নিজে এক এক সময় এক এক রকম বিবৃতি দিয়েছেন। ফলে রাহুলের মৃত্যুর কারণ নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। এই প্রসঙ্গে অম্বরীশ বললেন, "আমার মনে হয় ম্যাজিক মোমেন্টসের তরফে আরও সংবেদনশীল ভাবে বলা উচিত ছিল একদম গোড়া থেকেই। প্রথম থেকে যে কথাগুলো রটেছে, বলা হয়েছে সেগুলো আরও ভেবেচিন্তে বলা উচিত ছিল। হঠকারিতা করেছে। কারণ একটা প্রাণ চলে গিয়েছে। এটা প্রত্যাশিত ছিল না।" অভিনেতা জানালেন তিনিও গোটা ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত চান। তাঁর কথায়, "পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হোক ইন্ডাস্ট্রির প্রত্যেকে চাইছে। 'দিন আনি দিন খাই' টেকনিশিয়ানদেরও এতে আপত্তি নেই এই ধর্মঘটে। তাঁরাও চান এই ধর্মঘট হোক, নিরাপত্তা সুনির্দিষ্ট হোক।"
কেবল এতটুকুই নয়, অম্বরীশ এদিন উক্ত প্রযোজনা সংস্থার অমানবিক কাজ প্রসঙ্গেও মুখ খোলেন। রাহুলের মৃত্যুর সপ্তাহ ঘোরার আগেই তাঁদের তরফে যে ভোলে বাবা পার করেগার সিজন থ্রি ঘোষণা করা হয়েছিল সেই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, "আমার কোনও ধারণা নেই, মাথাই কাজ করছে না এটা কী করে সম্ভব। হজম করতে পারছি না।"
রাহুলের স্মৃতিতে এখনও বুঁদ অম্বরীশ। বেরোতে পারছেন না শোক, শক থেকে। বললেন, "ওর সঙ্গে কত স্মৃতি, কত আলোচনা... গান, থিয়েটার নিয়ে। কিছুদিন আগেই সহজ কথায় গিয়েছিলাম। সেসব নিয়ে আলোচনা হতো। ও বলত আমাদের এপিসোড ১ লাখ হবে, কাল সেটা অবশেষে ১ লাখ হল। কিন্তু এখন আর সেটা আমার কাছে ম্যাটার করছে না। কিন্তু যাঁরা ভাবছেন, আমার অনেক সহকর্মী হয়তো ভাবছেন আমি চুপ করে আছি। তাঁদের সেই ভুল ভাবনা দূর হওয়া দরকার। আমার কোনও শুটিং করতে ইচ্ছে করছে না। এতে আমার আর্থিক ক্ষতি হবে। হয় হোক। কিন্তু এর সমাধান আগে হওয়া দরকার।"















