আজকাল ওয়েবডেস্ক: শ্রীহরিকোটার সতীশ ধাওয়ান স্পেস সেন্টারে আজ সকাল থেকেই ব্যস্ততা চোখে পড়ার মতো। ইসরোর বিজ্ঞানী, ইঞ্জিনিয়ার ও টেকনিশিয়ানরা শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। কারণ আজ সকাল ১০টা ১৭ মিনিটে ইসরো উৎক্ষেপণ করতে চলেছে ২০২৬ সালের প্রথম বড় কক্ষপথ অভিযান পিএসএলভি-সি৬২ মিশন।
এই উৎক্ষেপণ নিছক নিয়মরক্ষার কোনও ঘটনা নয়। ইসরোর নির্ভরযোগ্য পিএসএলভি রকেট আজ একসঙ্গে ১৬টি উপগ্রহ নিয়ে পাড়ি দেবে সূর্য মেরু কক্ষপথে। এর মাধ্যমে ছোট ও মাঝারি উপগ্রহ উৎক্ষেপণের ক্ষেত্রে বিশ্ববাজারে ভারতের গুরুত্ব আরও এক ধাপ বাড়তে চলেছে।
এই মিশনের প্রধান আকর্ষণ EOS-N1 নামের একটি উন্নত আর্থ অবজারভেশন স্যাটেলাইট, যার নাম রাখা হয়েছে ‘অন্বেষা’। প্রতিরক্ষা গবেষণা সংস্থা DRDO তৈরি এই উপগ্রহে এমন ক্যামেরা রয়েছে, যা পৃথিবীর ছবি সাধারণ ক্যামেরার মতো শুধু রং দেখে নয়, বরং আলোর সূক্ষ্ম স্তর ধরে বিশ্লেষণ করতে পারে। এর ফলে ফসলের স্বাস্থ্য, মাটির আর্দ্রতা, খনিজ সম্পদ কিংবা শহরের বাড়বাড়ন্ত অনেক বেশি স্পষ্টভাবে বোঝা সম্ভব হবে। প্রতিরক্ষা ও পরিকল্পনার কাজেও এই তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই উৎক্ষেপণে প্রথমবার পরীক্ষামূলকভাবে পাঠানো হচ্ছে AayulSAT নামের একটি বিশেষ উপগ্রহ। বেঙ্গালুরু-ভিত্তিক একটি স্টার্টআপ তৈরি এই স্যাটেলাইটের লক্ষ্য মহাকাশে জ্বালানি ভরার প্রযুক্তি পরীক্ষা করা। সাধারণত উপগ্রহের জ্বালানি শেষ হয়ে গেলে সেগুলি অকেজো হয়ে পড়ে। AayulSAT সফল হলে ভবিষ্যতে কক্ষপথেই উপগ্রহে জ্বালানি ভরার পথ খুলে যেতে পারে, ফলে বহু উপগ্রহের কার্যকাল অনেকটা বেড়ে যাবে।
আরও একটি অভিনব উদ্যোগ এই মিশনের অংশ MOI-1 নামের একটি উপগ্রহ। এটি কক্ষপথে বসেই ছবি বিশ্লেষণ করতে পারে। সাধারণত উপগ্রহে তোলা ছবি পৃথিবীতে পাঠিয়ে বিশ্লেষণ করা হয়, যা সময়সাপেক্ষ। MOI-1 সেই কাজ মহাকাশেই করে ফেলতে পারবে। এর মাধ্যমে খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হবে। এই উপগ্রহের প্রসেসিং ক্ষমতা ভাড়া নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ স্বল্প খরচে ডেটা বিশ্লেষণের সুযোগও পাবেন।
MOI-1-এর মধ্যেই রয়েছে আরেকটি চমক বিশ্বের সবচেয়ে হালকা স্পেস টেলিস্কোপ MIRA। মাত্র আধা কেজির একটু বেশি ওজনের এই টেলিস্কোপ একটিমাত্র কাচের ব্লক থেকে তৈরি। ফলে উৎক্ষেপণের সময় প্রচণ্ড ঝাঁকুনিতেও এর ফোকাস নষ্ট হয় না। এটি একই সঙ্গে ছবি তুলবে এবং সঙ্গে সঙ্গেই সেই ছবি বিশ্লেষণও করবে।
এই উৎক্ষেপণ আন্তর্জাতিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। নেপালের একটি উপগ্রহ দেশটির ভূপ্রকৃতি মানচিত্র তৈরিতে সাহায্য করবে। স্পেনের একটি পরীক্ষামূলক ক্যাপসুল বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের প্রযুক্তি যাচাই করবে। এছাড়া মরিশাস ও ব্রাজিলের একাধিক উপগ্রহও রয়েছে এই মিশনে। কিছু উপগ্রহ সমুদ্রপথে উদ্ধার কাজে সাহায্য করবে, আবার একটি অভিনব উপগ্রহ মহাকাশে হাজার হাজার মানুষের নাম চিরদিনের জন্য সংরক্ষণ করবে।
দেশের ভিতর থেকেও একাধিক ভারতীয় সংস্থা তাদের তৈরি যোগাযোগ ও প্রযুক্তি উপগ্রহ পাঠাচ্ছে, যা ভবিষ্যতের স্বনির্ভর মহাকাশ প্রযুক্তির পথে বড় পদক্ষেপ। নির্ভরযোগ্য উৎক্ষেপণ, নতুন প্রযুক্তি আর দেশি-বিদেশি সহযোগিতার মেলবন্ধনে ইসরো আবারও প্রমাণ করতে চলেছে, বিশ্ব মহাকাশ মানচিত্রে ভারতের জায়গা এখন অনেকটাই শক্তিশালী।
