আজকাল ওয়েবডেস্ক: বিহারের ‘মাউন্টেন ম্যান’ দশরথ মাঝির কথা মনে আছে? পাহাড় কেটে রাস্তা বানিয়ে যিনি ভালোবাসার এক অনন্য নজির গড়েছিলেন, ওড়িশায় যেন ঠিক সেই ছবিই দেখা গেল। অসুস্থ স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য ৩০০ কিলোমিটার পথ রিকশা চালিয়ে হাসপাতালে নিয়ে গেলেন ৭৫ বছরের এক বৃদ্ধ।

সম্বলপুরের মোদিপাড়ার বাসিন্দা বাবু লোহারের সাজানো সংসারে হঠাৎই অন্ধকার নেমে আসে। তাঁর ৭০ বছরের স্ত্রী জ্যোতি প্যারালাইসিস হয়ে পড়েন। স্থানীয় চিকিৎসকরা জানান, তাঁকে বাঁচাতে হলে কটকের বড় হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। এদিকে পকেটে এত অর্থ নেই। বেসরকারি অ্যাম্বুল্যান্স ভাড়া করার ক্ষমতাও ছিল না বৃদ্ধের।

হাল না ছেড়ে নিজের পুরনো রিকশাটিকেই ‘অ্যাম্বুল্যান্স’ বানিয়ে ফেলেন বাবু। স্ত্রীর সুবিধার জন্য তাতে কিছু পুরনো কুশন পেতে দেন। সেই রিকশা চেপেই শুরু হয় দীর্ঘ লড়াই। সম্বলপুর থেকে কটক- ন’দিন ধরে রিকশা চালিয়ে স্ত্রীকে নিয়ে হাসপাতালে পৌঁছন তিনি। রাতে কখনও রাস্তার ধারের দোকানের পাশে মাথা গুঁজেছেন, আবার ভোরের আলো ফুটতেই প্যাডেল টেনেছেন।

হাসপাতালে দু’মাস চিকিৎসার পর কিছুটা সুস্থ হন জ্যোতি। গত ১৯ জানুয়ারি ফের রিকশা করে বাড়ির পথে রওনা দেন দম্পতি। কিন্তু ফেরার পথে ঘটে বিপত্তি। চৌদ্বারের কাছে একটি গাড়ি তাঁদের রিকশায় ধাক্কা মারলে ফের চোট পান বৃদ্ধা। স্থানীয় একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে তাঁদের ভর্তি করা হয়।

এত কষ্ট আর বিপদের মাঝেও দমে যাননি বাবু লোহার। তাঁর কথায়, “আমাদের কেউ নেই, আমরা দু’জনেই একে অপরের সব।” ওই স্বাস্থ্যকেন্দ্রের চিকিৎসক বিকাশ তাঁদের চিকিৎসার পাশাপাশি আর্থিক সাহায্যও করেন। প্রতিকূলতাকে হার মানানো বৃদ্ধের এই লড়াই এখন ওড়িশার মানুষের মুখে মুখে।

প্রসঙ্গত, এমনই আরেকটি ঘটনা ঘটে মধ্যপ্রদেশের সাগরে৷ সবজি বয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা যে ঠেলাগাড়িতে, তা'ই শেষ পর্যন্ত হয়ে উঠল তাঁর ‘অ্যাম্বুলেন্স’। গত শনিবার মধ্যপ্রদেশের সাগরে এক বৃদ্ধের জীবনসংগ্রামের এই করুণ ছবি নাড়িয়ে দিয়েছে সকলকে। যে গাড়িতে আলু-পটল সাজিয়ে দু’বেলা পেটের ভাত জোগাড় করেন পবন সাহু, সেই গাড়িই শেষমেশ তাঁর স্ত্রীর নিথর দেহের শয্যা হয়ে রইল।

পবন নিরক্ষর মানুষ। সরকারি দপ্তরের নম্বর তাঁর জানা নেই, নেই কোনও প্রভাব-প্রতিপত্তি। স্ত্রীর শরীর যখন খুব খারাপ হল, তিনি কেবল জানতেন হাতজোড় করে কাকুতি-মিনতি করতে। প্রতিবেশীদের দরজায় দরজায় ঘুরেছেন একটা অ্যাম্বুলেন্সের জন্য। অভিযোগ, কেউ একটা ফোন করার সাহায্যটুকুও করেননি।

মরিয়া পবন তখন নিজের সবজি ঠেলার গাড়িতেই স্ত্রীকে শুইয়ে দিলেন। আলু-টমেটোর জায়গায় তখন যন্ত্রণায় ছটফট করা তাঁর জীবনসঙ্গিনী। প্রাণপণ শক্তিতে সেই গাড়ি টেনে পবন যখন হাসপাতালের দিকে ছুটছেন, তখনই সব শেষ। পথেই মারা যান তাঁর স্ত্রী।

রাস্তার ওপর পড়ে রইল পবনের স্ত্রীর নিথর দেহ। পাশে অসহায় পবন। স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, উত্তরপ্রদেশের ললিতপুরের বাসিন্দা পবন গত এক দশক ধরে সাগরে সবজি বিক্রি করে কোনওমতে সংসার চালাতেন। স্ত্রীর দীর্ঘদিনের অসুখে জমানো পুঁজি আগেই শেষ হয়েছিল। অ্যাম্বুলেন্স ডাকার ক্ষমতা বা জ্ঞান কোনওটাই তাঁর ছিল না।

স্ত্রীর মৃত্যুর পর রাস্তার মাঝেই কান্নায় ভেঙে পড়েন বৃদ্ধ পবন। সেই আর্তনাদ দেখে পথচারীদেরও চোখের জল বাঁধ মানেনি। পরে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সহায়তায় শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। স্বাস্থ্য দপ্তরের আধিকারিক মমতা তিমোরি জানিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে। কেন অ্যাম্বুলেন্স মিলল না, তা খতিয়ে দেখে পরিবারটিকে সাহায্যের আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।