আজকাল ওয়েবডেস্ক: অবশেষে তীব্র কটাক্ষ এবং সমালোচনার মুখে পড়ে নিজেদের সিদ্ধান্ত বদলাতে বাধ্য হল ন্যাশনাল কাউন্সিল অফ এডুকেশনাল রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং (এনসিইআরটি)। নবম শ্রেণীর শিল্পকলার পাঠ্যবইয়ে সিন্ধু সভ্যতার অন্যতম ঐতিহাসিক নিদর্শন মহেঞ্জোদারোর যে নারীমূর্তির ছবি ছিল, তার উর্ধ্‌বাঙ্গ কালো কাপড়ে মুড়ে ফেলা হয়েছিল। সেই খবর প্রকাশিত হতেই দেশজুড়ে বিতর্ক দানা বাঁধে। মঙ্গলবারই এনসিইআরটি-র পক্ষ থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়, নতুন পরিবর্তিত ছবিটির বদলে মূর্তির আসল ছবিটিই বইয়ে ফের ফিরিয়ে আনা হবে। সংবাদসংস্থা পিটিআই-এর খবর, তাদেরকে এনসিইআরটি-র ডিরেক্টর দীনেশ সাকলানি স্পষ্ট ভাবে সে কথাই জানিয়েছেন।

 

এনসিইআরটি-র নবম শ্রেণীর নতুন পাঠ্যবই 'মধুরিমা'-র প্রথম অধ্যায় 'শিল্পকলার ইতিহাস'-এ ঐতিহাসিক 'ডান্সিং গার্ল' বা 'নৃত্যরত নারী'-র ব্রোঞ্জ মূর্তিটির একটি ছবি ব্যবহার করা হয়েছিল। সেখানে আসল মূর্তির উন্মুক্ত উর্ধ্বাঙ্গের গঠনকে ঢাকা দেওয়া হয়। এর জন্য কম্পিউটারে কারসাজিতে কালো রং ব্যবহার করে আসল মূর্তিটি ঢেকে সেটি বিকৃত করা হয়। এই ঘটনা সামনে আসতেই দেশের শিক্ষাবিদ থেকে ইতিহাসবিদেরা ক্ষোভে ফেটে পড়েন।

 

তবে উল্লেখযোগ্য বিষয়, ষষ্ঠ শ্রেণীর সমাজবিজ্ঞান বইতে কিন্তু একই মূর্তির আসল রূপটিই রাখা হয়েছে। ষষ্ঠ শ্রেণীর পাঠ্যপুস্তক উন্নয়ন কমিটির প্রধান মিশেল দানিনো জানান, ষষ্ঠ শ্রেণীর বই তৈরির সময় তাঁদের বলা হয়েছিল যে এই মূর্তিটি নাকি শিশুদের জন্য 'বয়স-উপযুক্ত' নয়। সেই প্রসঙ্গে মিশেল দানিনো বলেন, "আমাদের কমিটি এই যুক্তিতে রাজি হয়নি। আমরা ষষ্ঠ শ্রেণীর শিক্ষকদের সঙ্গেও এ নিয়ে কথা বলেছিলাম। তাঁরাও জানান এই মূর্তি নিয়ে পড়াতে কোনওদিন তাঁদের কোনও সমস্যা হয়নি। নগ্নতাকে অশোভন মনে করার এই মানসিকতা আসলে প্রাচীন ভিক্টোরিয়ান ধ্যানধারণা। অথচ আমরাই ভারতীয় শিক্ষাব্যবস্থাকে ঔপনিবেশিক ধারণামুক্ত করার কথা বলি!"

 

নবম শ্রেণীর বইতে মূর্তির ওই বিকৃত রূপ দেখে বিস্ময় প্রকাশ করে দানিনো বলেন, "মধ্যযুগে চার্চ যেভাবে মাইকেলেঞ্জেলোর বিখ্যাত 'ডেভিড' মূর্তিতে ডুমুরের পাতা জুড়ে দিয়ে শিল্পকে বিকৃত করেছিল, এটিও ঠিক তেমনই। ঐতিহাসিক নিদর্শনকে এভাবে বদলে দেওয়া মানে একটি 'নকল প্রত্নতাত্ত্বিক বস্তু' তৈরি করা। যা একপ্রকার ইতিহাস অবমাননাই।"

 

সংবাদমাধ্যমের খবর, ডিজিটাল মাধ্যমে থাকা এই বইয়ের ছবি দ্রুত বদলে ফেলা হবে। তবে যে সব বই ছাপানো হয়ে গিয়েছে, তাতে নতুন করে ছবি বদলানো হচ্ছে না। তবে, এখনও কিছু বই ছাপানো বাকি, তাতে পুরোনো ছবিই বসানো হবে। পরবর্তী শিক্ষাবর্ষ থেকে নতুন বইয়ে আবার পুরোনো ছবি রাখার ব্যবস্থা করা হবে।

 

উল্লেখ্য, মহেঞ্জোদারো থেকে আবিষ্কৃত প্রায় ২৬০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দের এই ব্রোঞ্জ মূর্তিটি সিন্ধু সভ্যতার সেরা নিদর্শনগুলির মধ্যে অন্যতম। মূর্তিটি প্রাচীন 'লস্ট-ওয়াক্স' বা মোম গলানো পদ্ধতিতে তৈরি করা হয়েছিল। রাজস্থানের ভিরানা নামক হরপ্পা সভ্যতার স্থলেও ঠিক একই ভঙ্গিমার দু'টি মাটির পাত্রের টুকরো পাওয়া গেছে, যা প্রমাণ করে এই বিশেষ ভঙ্গিমাটির একটি নির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক বা শৈল্পিক মূল্য ছিল।