আজকাল ওয়েবডেস্ক: কোটায় আইআইটি (IIT) জয় করার ইঁদুরদৌড়ে প্রতি বছরই হাজার হাজার স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। কিন্তু কিছু গল্প এমনও থাকে, যা শুধু সফলতার নয়, বরং অদম্য লড়াই, জেদ আর এক মায়ের নিঃস্বার্থ বলিদানের রূপকথা হয়ে থেকে যায়। বিহারের সীতামড়ির গুঞ্জন কুমার এবং তাঁর মা গুঞ্জা দেবীর গল্পটি ঠিক তেমনই। মারাত্মক শারীরিক অসুস্থতা ও চোখের তীব্র দুর্বলতাকে হারিয়ে গুঞ্জন যখন এ বছর আইআইটি দিল্লি (IIT Delhi)-তে কম্পিউটার সায়েন্স পড়ার সুযোগ পেলেন, তখন প্রদীপের আলোর তলার সেই অন্ধকার লড়াইটার কথা সামনে এল, যা চোখের জল এনে দেয়।

২০২১ সালের জেইই (JEE) টপার মৃদুল আগরওয়ালের সাফল্য দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে ২০২৩ সালে কোটায় পাড়ি দিয়েছিল বিহারের ছেলে গুঞ্জন। সব ঠিকঠাকই চলছিল। কিন্তু বিপত্তি ঘটল ২০২৫ সালের অক্টোবরে, পরীক্ষার ঠিক কয়েক মাস আগে। গুঞ্জনের হঠাৎ ধরা পড়ে 'নিউমোথোরাক্স' (Pneumothorax)— সহজ কথায়, যার ফলে ফুসফুস সম্পূর্ণ বসে বা বিকল হয়ে যায়। ডাক্তার সাফ জানিয়ে দেন, টানা তিন মাস সম্পূর্ণ শয্যাশায়ী থাকতে হবে। কোটার চড়া কম্পিটিশনের মাঝে পরীক্ষার মাত্র কয়েক মাস আগে তিন মাস কোচিং ক্লাসে যেতে না পারা মানে যেকোনও  পড়ুয়ার কাছেই স্বপ্নভঙ্গ। গুঞ্জনও যখন চরম হতাশায় ডুবছেন, ঠিক তখনই ঢাল হয়ে দাঁড়ালেন তাঁর মা।

গুঞ্জনের মা গুঞ্জা দেবী পেশায় গৃহবধূ হলেও তাঁর বি.এড ডিগ্রি ছিল। ছেলের স্বপ্নকে চোখের সামনে এভাবে শেষ হয়ে যেতে দিতে চাননি তিনি। তিনি নিজেই গুঞ্জনের সহপাঠী হয়ে উঠলেন। ছেলের পাশে বসে ল্যাপটপে অনলাইন ক্লাস দেখতে শুরু করলেন মা। শিক্ষকেরা কী পড়াচ্ছেন, কোন ফর্মুলা শেখাচ্ছেন— তার খুঁটিনাটি মন দিয়ে শুনে নিজে হাতে নোটস তৈরি করতে লাগলেন। টানা তিন মাস মায়ের তৈরি সেই হাতে লেখা নোটস পড়েই বিছানায় শুয়ে শুয়ে পড়াশোনা চালিয়ে গেল গুঞ্জন। মা তাঁর চোখের সামনে পড়াশোনার কোনও  খামতি হতে দিলেন না।

গুঞ্জনের লড়াইটা শুধু এই আকস্মিক ফুসফুসের রোগেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁর চোখের দৃষ্টিশক্তি ৭০ শতাংশেরও বেশি দুর্বল। মাইনাস ৯.৫ পাওয়ারের চশমা পরে তাঁকে পড়াশোনা করতে হতো। কিন্তু এই শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তাঁর জেদের কাছে হার মেনেছিল। মাঠে নেমে লড়াইয়ের ফলও মিলল হাতেনাতে। প্রথমে জেইই মেইনসে ৯১.৮ পার্সেন্টাইল এবং পরবর্তীতে জেইই অ্যাডভান্সেড (JEE Advanced)-এ পিডব্লিউডি ওবিসি (PWD OBC) ক্যাটাগরিতে সর্বভারতীয় ৫০ নম্বর র‍্যাঙ্ক (Common PWD Rank 120) ছিনিয়ে নেন গুঞ্জন। আজ তিনি আইআইটি দিল্লির অন্যতম সেরা বিভাগ কম্পিউটার সায়েন্সে ভর্তি হওয়ার জন্য প্রস্তুত।

গুঞ্জনের বাবা বর্ডার রোডস অর্গানাইজেশন (BRO)-এর একজন ইঞ্জিনিয়ার এবং তাঁর ছোট ভাইও বর্তমানে কোটায় জেইই-র প্রস্তুতি নিচ্ছেন। গুঞ্জনের কথায়, পরিস্থিতি সবসময় আপনার পক্ষে থাকবে না, কিন্তু সাহস আর ইতিবাচক মানসিকতা থাকলে যেকোনো বাধা পেরিয়ে এগিয়ে যাওয়া যায়। অন্যদিকে মা গুঞ্জা দেবীর সহজ স্বীকারোক্তি, ছেলের স্বপ্নটাই আমার স্বপ্ন হয়ে গিয়েছিল। ও যখন অসুস্থ হল, আমি শুধু ওর সাথে একটু পড়াশোনা করেছিলাম। কোটার এই হৃদয়স্পর্শী কাহিনী প্রমাণ করে দিল— আইআইটির কঠিন বৈতরণী পার হতে শুধু মেধা নয়, ব্যাকবেঞ্চে বসে থাকা মায়েদের এমন নীরব প্রার্থনা আর খাতার পাতায় জমে থাকা ভালোবাসারও বড় প্রয়োজন হয়।