আজকাল ওয়েবডেস্ক: সোমবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি 'ভারতীয় জনসংঘ'-এর প্রতিষ্ঠাতা ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির ১২৫তম জন্মবার্ষিকীতে তাঁকে গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। তিনি শ্যামাপ্রসাদের জনজীবনের মূলমন্ত্র হিসেবে "ভারতের অখণ্ডতা"-র প্রতি তাঁর অবিচল অঙ্গীকারের কথা উল্লেখ করেন এবং জোর দিয়ে বলেন যে, ২০১৯ সালে ৩৭০ ও ৩৫-এ ধারা বাতিলই ছিল তাঁর আত্মত্যাগের প্রতি "সবচেয়ে যথার্থ শ্রদ্ধাঞ্জলি"।
'ভারতের ঐক্য ও অগ্রগতির জন্য উৎসর্গীকৃত জীবন' শীর্ষক এক বিস্তারিত নিবন্ধে প্রধানমন্ত্রী মোদী লেখেন যে, 'শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির চরম আত্মত্যাগ "রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় স্মৃতির অংশ হয়ে উঠেছে।' তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদার বিরোধিতা করার বিষয়টিই শেষ পর্যন্ত এই প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর রাজনৈতিক ঐতিহ্যের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছিল।
প্রধানমন্ত্রী লেখেন, 'ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে যখন কোনও ব্যক্তির চরম আত্মত্যাগ রাজনীতির গণ্ডি পেরিয়ে জাতীয় স্মৃতির অংশ হয়ে ওঠে। ড. মুখার্জির শেষ যাত্রাও তেমনই একটি মুহূর্ত।' তিনি আরও যোগ করেন, 'বহু বছর পর, ২০১৯ সালে ৩৭০ ও ৩৫-এ ধারা বাতিল ছিল তাঁর আত্মবলিদানের প্রতি সবচেয়ে যথার্থ শ্রদ্ধাঞ্জলি।'
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির জয়ের ঠিক পরেই এই শ্রদ্ধা নিবেদনের ঘটনাটি ঘটল। উল্লেখ্য, এই বাংলার সঙ্গে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত ঐতিহ্য গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।
৬ জুলাই দিনটিকে "জাতীয়তাবাদ ও নিঃস্বার্থ সেবার আদর্শে বিশ্বাসী অসংখ্য মানুষের কাছে একটি বিশেষ দিন" হিসেবে অভিহিত করে প্রধানমন্ত্রী মোদি শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জিকে এমন একজন নেতা হিসেবে বর্ণনা করেন, যিনি "মেধা, জনসেবা ও নৈতিক দৃঢ়তার এক অপূর্ব সংমিশ্রণ" ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী স্মরণ করেন যে, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ স্যার আশুতোষ মুখার্জির পুত্র হিসেবে সুবিধাজনক পরিবেশে জন্মগ্রহণ করা সত্ত্বেও ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি ব্যক্তিগত আরাম-আয়েশের পরিবর্তে জনসেবার জীবন বেছে নিয়েছিলেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, শিশুপুত্র ও পরবর্তীতে স্ত্রীর মৃত্যুর মতো ব্যক্তিগত শোকের ঘটনাগুলো দেশসেবায় শ্যামাপ্রসাদের সংকল্পকে আরও দৃঢ় করেছিল। মোদি লেখেন, 'ড. মুখার্জির জনজীবনকে যদি কোনও একটি আদর্শ সবচেয়ে বেশি সংজ্ঞায়িত করে থাকে, তবে তা হল ভারতের অখণ্ডতা।' তিনি বলেন, দেশভাগের সময় পশ্চিমবঙ্গ যাতে ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে টিকে থাকে, তা নিশ্চিত করতে মুখার্জি অবিচল ছিলেন। পরবর্তীকালে জম্মু ও কাশ্মীর বিষয়ক আন্দোলনেও তিনি সেই একই দৃঢ় প্রত্যয় বজায় রেখেছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী মোদি ড. মুখার্জিকে একজন দূরদর্শী সংস্কারক হিসেবে অভিহিত করেন, যিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বকনিষ্ঠ উপাচার্য হয়েছিলেন এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণার বিস্তার, গ্রন্থাগারের উন্নয়ন, কৃষি শিক্ষার প্রসার, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও ছাত্রকল্যাণমূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটিকে আধুনিক করে তুলেছিলেন।
শিক্ষার বিষয়ে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে মোদি লিখেছেন, 'শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে কেবল সম্ভাব্য কেরানি বা স্বল্প বেতনের কর্মী তৈরির কারখানা হিসেবে দেখা ভুল। আমাদের এমন শিক্ষার্থী গড়ে তুলতে হবে যারা নেতৃত্ব প্রদানে সক্ষম।' তিনি বলেন, এই উক্তিটি মুখার্জির সেই বিশ্বাসের প্রতিফলন ঘটায় যে, শিক্ষার লক্ষ্য হওয়া উচিত কেবল চাকরিপ্রার্থী নয়, বরং জাতি-নির্মাতা তৈরি করা।
প্রধানমন্ত্রী স্বাধীন ভারতের প্রথম শিল্প ও সরবরাহ মন্ত্রী হিসেবে শ্যাাপ্রসাদ মুখার্জির কার্যকালের কথাও তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, দামোদর ভ্যালি কর্পোরেশন এবং সিন্দ্রি সার কারখানার মতো উদ্যোগের মাধ্যমে আধুনিক শিল্পায়নের ভিত্তি স্থাপনের পাশাপাশি তাঁতশিল্প, কারিগর ও কুটির শিল্পের বিকাশেও মুখার্জি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। ব্যক্তিগত অনুভূতির কথা জানিয়ে মোদি বলেন, তাঁর সরকার সিন্দ্রি সার কারখানাটিকে পুনরায় চালু করতে পেরে গর্বিত, অথচ মুখার্জির ‘আত্মনির্ভরতা’র স্বপ্ন থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘ সময় ধরে এই কারখানাটি অবহেলিত অবস্থায় পড়ে ছিল।
নিবন্ধটিতে মুখার্জিকে গণতান্ত্রিক বিতর্কের একজন বলিষ্ঠ প্রবক্তা হিসেবেও তুলে ধরা হয়েছে। এতে স্মরণ করা হয়েছে যে, মতাদর্শগত পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও তিনি জওহরলাল নেহরুর প্রথম মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়েছিলেন, কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন যে জাতি গঠনের জন্য পারস্পরিক সহযোগিতা প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রী মোদি লিখেছেন, 'মুখার্জি তখনই পদত্যাগ করেছিলেন যখন তিনি অনুভব করেছিলেন যে “জাতীয় স্বার্থে ভিন্ন কোনও পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি'। অর্থাৎ তিনি ক্ষমতার চেয়ে নীতিকেই প্রাধান্য দিয়েছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী মোদী সংবিধানের প্রথম সংশোধনীর প্রতি শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির বিরোধিতার কথাও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, শ্যামাপ্রসাদ বাক-স্বাধীনতার ওপর বিধিনিষেধ আরোপের বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন এবং পরবর্তী ঘটনাবলি (যার মধ্যে জরুরি অবস্থাও অন্তর্ভুক্ত) তাঁর সেই আশঙ্কার যথার্থতা প্রমাণ করেছিল।
রাজনীতির বাইরেও প্রধানমন্ত্রী ১৯৪৩ সালের বাংলা দুর্ভিক্ষ এবং ১৯৪২ সালের মেদিনীপুরের ঘূর্ণিঝড়-পরবর্তী ত্রাণকার্যে মুখার্জির মানবিক ভূমিকার কথা তুলে ধরেন। তিনি মুখার্জিকে এমন একজন নেতা হিসেবে বর্ণনা করেন যিনি সঙ্কটের সময়েও জনসেবায় সমানভাবে নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন।
শ্রদ্ধাঞ্জলি জানানোর শেষ পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী মোদি তরুণদের উদ্দেশ্যে মুখার্জির দেওয়া বার্তাটি স্মরণ করেন, 'যে কাজই তোমরা হাতে নাও না কেন, তা নিষ্ঠা, পুঙ্খানুপুঙ্খতা ও দক্ষতার সঙ্গে সম্পন্ন করো, কখনওই কোনও কাজ অসম্পূর্ণ বা অসমাপ্ত রেখো না।' তিনি বলেন, মুখার্জির প্রতি শ্রেষ্ঠ শ্রদ্ধা নিবেদন করা হবে যদি আমরা 'এমন এক শক্তিশালী, ঐক্যবদ্ধ, আত্মবিশ্বাসী ও সহানুভূতিশীল ভারত গড়ে তুলতে পারি - যার ওপর তিনি গভীর আস্থা রাখতেন।' তাঁর আসা, দেশের তরুণরাই শ্যামাপ্রসাদের সেই স্বপ্নকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।















