আজকাল ওয়েবডেস্ক: গোয়া মানেই অনেকের মনে আসে রোদঝলমলে সৈকত, পার্টি, ট্রান্স মিউজিক, পর্তুগিজ স্থাপত্য, ফেনি আর একটানা নাইটলাইফ—কিন্তু এই চেনা ভাবনাকে একেবারে বদলে দিল একটি ঘটনা। সাউথ গোয়ার পার্টাগলির শ্রী সংস্থান গোকর্ণ পার্টাগলি জীবোত্তম মঠ প্রাঙ্গণে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি উন্মোচন করলেন বিশ্বের সর্বোচ্চ, ৭৭ ফুট উঁচু ব্রোঞ্জের রাম মূর্তি। গোয়ার সঙ্গে যাদের মাথায় খ্রিস্টান সংস্কৃতি বা পর্তুগিজ ঐতিহ্যের ছবি ভেসে ওঠে, তাদের কাছে প্রশ্ন জাগতেই পারে—গোয়ায় এত বিশাল রাম মূর্তি কেন?
এর উত্তর লুকিয়ে রয়েছে গোয়ার গভীর, বহুস্তরীয় আধ্যাত্মিক ইতিহাসে, যা উপনিবেশকালীন অতীতের বহু আগেই শুরু হয়েছিল এবং যুগের পর যুগ ধরে টিকে রয়েছে।
মোদি উন্মোচন করলেন বিশ্বের সর্বোচ্চ রাম মূর্তি। ৭৭ ফুট ব্রোঞ্জের এই মূর্তিটির নির্মাতা বিখ্যাত ভাস্কর রাম ভি সুতার, যিনি স্ট্যাচু অফ ইউনিটিরও স্রষ্টা। প্রধানমন্ত্রী মোদি এটিকে ভারতের ঐক্য, ভক্তি ও সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতার প্রতীক হিসেবে বর্ণনা করেন। উন্মোচন অনুষ্ঠানটি ছিল শ্রী সংস্থান গোকর্ণ পার্টাগলি জীবোত্তম মঠের ৫৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অংশ। ভারতের অন্যতম প্রাচীন দ্বৈত বৈষ্ণব প্রতিষ্ঠান এটি, যা গৌড় সারস্বত ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের প্রাচীনতম আধ্যাত্মিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।
মোদি একই অনুষ্ঠানে রামায়ণ থিম পার্কও উদ্বোধন করেন, বিশেষ ডাকটিকিট ও স্মারক মুদ্রা প্রকাশ করেন এবং প্রায় ১৫,০০০ উপস্থিত মানুষের উদ্দেশে বক্তব্য রাখেন। তাঁর কথায়, গোয়ার মঠ ও মন্দিরগুলি একসময় আক্রমণ ও ধ্বংসের মুখোমুখি হয়েছিল, কিন্তু ঐতিহ্য হারায়নি।
গোয়ায় কেন রাম ভক্তির এত গভীর শিকড়?
দ্বৈত বৈষ্ণব দর্শন মতে ঈশ্বর (বিষ্ণু) ও আত্মা পৃথক, আর বিষ্ণুর অবতার হিসেবে রাম তাঁদের অন্যতম প্রধান উপাস্য। এই দর্শনভিত্তিক মঠ ও মন্দিরগুলিতে রামচন্দ্রের পূজা স্বাভাবিক। তাই পার্টাগলি মঠে রামের কেন্দ্রস্থানে থাকা মোটেই নতুন নয়।
আজ থেকে ৫৫০ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত এই মঠ গৌড় সারস্বত ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের প্রথম বৈষ্ণব প্রতিষ্ঠান। কঙ্কন উপকূলের গোয়া, কর্ণাটক ও মহারাষ্ট্রজুড়ে সারস্বত হিন্দুদের কাছে এটি যুগ যুগ ধরে সাংস্কৃতিক আশ্রয়স্থল। কুশাবতী নদীর তীরে অবস্থিত মঠটির রয়েছে সমৃদ্ধ ইতিহাস—যা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে গোয়ার পর্তুগিজ শাসনকালকে বিবেচনা করলে।
পর্তুগিজ শাসনে টিকে থাকা এক গভীর ঐতিহ্য
১৫১০ থেকে ১৯৬১ পর্যন্ত পর্তুগিজ শাসনে বহু হিন্দু প্রতিষ্ঠান চাপ, অত্যাচার ও স্থানচ্যুতির মুখোমুখি হয়েছিল। কিন্তু পার্টাগলি মঠ সেই কঠিন সময়েও টিকে থাকে। এই মঠেই রক্ষা করা হয়েছিল শ্রী বীর মূলারাম দেবরুর মত প্রাচীন রাম মূর্তি এবং বহু শাস্ত্র ও আচার।
গোয়ায় রাম ভক্তির আধুনিক উত্থান
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গোয়ার রাম ভক্তির প্রকাশ আরও দৃশ্যমান হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী প্রমোদ সাওয়ন্ত অযোধ্যায় ‘গোয়া ভবন’ নির্মাণের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন এবং রাম মূর্তি প্রকল্পকে সরাসরি সমর্থন করেছেন। ২০২৪ সালের ২২ জানুয়ারি রাম মন্দির উদ্বোধনের দিন গোয়াজুড়ে যেভাবে শোভাযাত্রা, পূজা ও উদ্যাপন হয়েছে, তা অনেক বহিরাগতকেই বিস্মিত করেছে।
সব মিলিয়ে, পার্টাগলিতে রামের বিশ্বের সর্বোচ্চ মূর্তি স্থাপন গোয়ার জন্য শুধু গর্বের নয়—এটি প্রমাণ করে যে সৈকত ও পার্টির ওপরে গোয়ায় আরও গভীর, শাশ্বত আধ্যাত্মিক ধারা প্রবাহিত। শতাধিক বছরের উপনিবেশবাদ, সাংস্কৃতিক পরিবর্তন ও সময়ের স্রোত পেরিয়েও সেই ধারাই আজ এত মহিমায় দৃশ্যমান।
