আবু হায়াত বিশ্বাস, ভোপাল: ভারত–মার্কিন বাণিজ্য চুক্তিকে কেন্দ্র করে জাতীয় রাজনীতিতে নতুন করে উত্তাপ ছড়াল। বিজেপি শাসিত মধ্য প্রদেশের রাজধানী ভোপালে আয়োজিত ‘কিসান সম্মেলন’-এর মঞ্চ থেকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানালেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী। তাঁর বক্তব্য, ‘যদি সাহস থাকে, তাহলে ভারত–আমেরিকা বাণিজ্য চুক্তি বাতিল করে দেখান।’এদিন মোদি সরকারকে নজিরবিহীন আক্রমণ করল কংগ্রেস। দেশের প্রধান বিরোধী দল অভিযোগ তুলল, আমেরিকার চাপের কাছে নরেন্দ্র মোদি আত্মসমর্পণ করেছে। ‘কিসান সম্মেলন’-এর মঞ্চ থেকে কেন্দ্রের বিজেপি সরকারকে তুলোধোনা করেন রাহুল, মল্লিকার্জুন খাড়গেরা।
রাহুলের বক্তব্য, কারও সঙ্গে কোনও আলোচনা না করে, মন্ত্রিসভায় কোনও আলোচনা ছাড়াই মোদি চুক্তি করেছেন! কৃষকদের স্বার্থকে জলাঞ্জলি দেওয়া হয়েছে। মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ইতিমধ্যেই ট্রাম্পের আরোপিত শুল্ক বাতিল করেছে। এরপরেই বিভিন্ন দেশ চুক্তি স্থগিত রেখেছে বলে দাবি রাহুলের। কিন্তু নরেন্দ্র মোদি এবিষয়ে একটি শব্দও উচ্চারণ করেননি বলে অভিযোগ কংগ্রেস নেতার। চুক্তির পেছনে রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত চাপ কাজ করেছে বলেও ইঙ্গিত দেন কংগ্রেস নেতা। এদিন রাহুল বলছেন, ‘আমি নরেন্দ্র মোদিকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছি। যদি আপনার সাহস থাকে, তাহলে ভারত এবং আমেরিকার মধ্যে চুক্তি বাতিল করুন। আদানি মামলা এবং এপস্টাইনের হুমকির কারণে এটি করা যাবে না।’ বিরোধী দলনেতার অভিযোগ, আমেরিকার কাছে দেশ বিক্রির চুক্তি করছেন মোদি! একদিকে এপস্টিন ফাইল অন্যদিকে, আদানির বিরুদ্ধে মার্কিন আদালতে মামলা ঝুলছে, এমন অবস্থায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে মোদি সরকার। আমেরিকার কাছে ভারতীয় ডেটা তুলে দেওয়ার অভিযোগও করেন রাহুল। তাঁর দাবি,‘বিশ্বের সবচেয়ে বেশি তথ্য ভারতের কাছে রয়েছে, দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে চীন। ভারতের তথ্য ছাড়া আমেরিকা চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারবে না। এই চুক্তিতে, ছোট এক স্ক্রিপ্টে সমস্ত তথ্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করেছেন মোদি।’ রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভারত–মার্কিন সম্পর্ক কৌশলগত ও অর্থনৈতিক—দুই দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে বিরোধী দলের অভিযোগ নতুন নয়; অতীতেও কৃষি ও শিল্প সুরক্ষা নিয়ে উদ্বেগ উঠেছে। তবে এবারের বিতর্কে ব্যক্তিগত চাপ, আন্তর্জাতিক মামলা এবং তথ্য নিরাপত্তার প্রশ্ন সামনে আসায় বিষয়টি আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে।
ভারত-মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির ফলে কৃষকদের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হবে বলে দাবি করেন কংগ্রেস নেতা। রাহুলের দাবি, বাণিজ্য চুক্তির ফলে দেশের কৃষক, টেক্সটাইল শিল্প ও দেশীয় উৎপাদন মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে। তাঁর অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ভারতকে প্রতি বছর বিপুল অঙ্কের মার্কিন পণ্য আমদানি করতে হতে পারে, অথচ এর বিনিময়ে ভারত কী লাভ পেল, তা স্পষ্ট নয়। তিনি বলেন, ‘চাপের মুখে সরকার সব মেনে নিয়েছে। কিন্তু দেশ কী পেল?’ বাণিজ্য চুক্তির পিছনে রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত চাপ কাজ করেছে বলেও ইঙ্গিত দেন রাহুল। তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রে ‘এপস্টাইন ফাইল’ প্রকাশকে ঘিরে চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরীর নাম প্রকাশ সেই চাপেরই অংশ।এছাড়া শিল্পপতি গৌতম আদানি-র বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে চলমান ফৌজদারি মামলার প্রসঙ্গ টেনে রাহুল গান্ধী বলেন, এই মামলা কেবল একজন শিল্পপতির বিরুদ্ধে নয়, বরং সরকারের সঙ্গে তার আর্থিক সম্পর্কের প্রশ্নও জড়িত।
রাহুলের অভিযোগ,‘ভারতের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিরোধী দলনেতাকে লোকসভায় কথা বলতে দেওয়া হয়নি। আমি চাইছিলাম চীনা অনুপ্রবেশের বিষয়টি উত্থাপন করতে।’ বিরোধী দলনেতার দাবি, লোকসভায় প্রাক্তন সেনাপ্রধান এম এম নরবনের বইয়ের বিষয়টি উত্থাপন করায় তাঁকে বার বার বলতে বাধা দেওয়া হয়। অন্যদিকে, কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গেও মোদিকে নিশানা করেছেন। বলেছেন,‘ট্রাম্পের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস নেই মোদির। ছোট ছোট দেশ কৃষকদের জন্য লড়ছে, অথচ ভারতের কৃষকদের জন্য মোদিজি চুপ করে বসে আছেন।’ খাড়গে বলেছেন, নরেন্দ্র মোদি হলেন আত্মসমর্পণকারী মোদি। তিনি দেশ বিক্রি করেছেন এবং কৃষকদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। নাম বদলের রাজনীতি নিয়েও সরব হন খাড়গে। দাবি করেন,‘মোদির কাজই হল নাম বদল করা। মনরেগার নাম বদল করেছে। রাস্তার নাম, বিভিন্ন প্রকল্পের নাম বদল করেছে। মোদি এবার নিজের নামটাই বদল করে নিক, কেন না তিনি তো কংগ্রেস শাসনকালেই জন্মেছেন!’ খাড়গের দাবি, ৬০ বছর ধরে রাজনৈতিক ময়দানে আছেন তিনি, কিন্তু এমন প্রধানমন্ত্রী কখনও দেখেননি। বিরোধীদের সঙ্গে চোখে চোখ মেলাতে পারেন না। সংসদে নিজের কথা বলতে পারেন না। একটা প্রেস কনফারেন্সও করতে পারেন না। নরেন্দ্র মোদি কংগ্রেসকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করছেন, কিন্তু তারা ভয় পান না বলেও দাবি করেন খাড়গে।
