আজকাল ওয়েবডেস্ক: নরেন্দ্র মোদি সরকারের প্রথম মেয়াদে ২০১৬ সালে ‘দেশবিরোধী স্লোগান’-এর অভিযোগে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় (জেএনইউ) যে অভূতপূর্ব দমন–অভিযানের মুখে পড়েছিল, প্রায় এক দশক পর ফের সেই ক্যাম্পাসই এক বড়সড় সংঘাতের কেন্দ্রে। অভিযোগের ধরন বদলালেও, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পদক্ষেপের চরিত্র যে প্রায় একই রয়ে গেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন ছাত্র, শিক্ষক ও প্রাক্তনীদের এক বড় অংশ।

এই প্রথমবার, জেএনইউ প্রশাসন একযোগে জওহরলাল নেহরু ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্টস ইউনিয়নের (JNUSU) চারজন নির্বাচিত পদাধিকারী—সভাপতি, সহ-সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও যুগ্ম সম্পাদক-কে সাসপেন্ড করল এবং তাঁদের জন্য ক্যাম্পাস সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হল। একই শাস্তি দেওয়া হয়েছে প্রাক্তন জেএনইউএসইউ সভাপতি নীতিশ কুমারকেও।

বর্তমান সভাপতি আদিতি মিশ্র, সহ-সভাপতি গোপিকা বাবু, সাধারণ সম্পাদক সুনীল যাদব, যুগ্ম সম্পাদক দানিশ আলি এবং প্রাক্তন সভাপতি নীতিশ কুমার—এই পাঁচজনকে ২০ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। পাশাপাশি ২০২৬ সালের শীতকাল ও বর্ষাকাল—দু’টি সেমেস্টারেই তাঁদের ক্যাম্পাসে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গিয়েছে, ২০২৫ সালের ২১ নভেম্বর বি. আর. আম্বেদকর সেন্ট্রাল লাইব্রেরিতে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনার প্রেক্ষিতে প্রোক্টোরিয়াল তদন্তের পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অভিযোগ, ওই দিন কিছু ছাত্র মুখ শনাক্তকরণ (ফেসিয়াল রিকগনিশন) গেট এবং সিসিটিভি ক্যামেরা ভাঙচুর করেন, যার ফলে প্রায় ২০ লক্ষ টাকার ক্ষতি হয়েছে।

তবে বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলি—বিশেষ করে আইসা (AISA) ও এসএফআই (SFI)—এই শাস্তিকে সরাসরি ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা’ বলে বর্ণনা করেছে। তাঁদের দাবি, ক্যাম্পাসে নজরদারি ব্যবস্থার বিরোধিতা এবং ভিন্নমত প্রকাশের কারণেই ছাত্র সংসদকে নিশানা করা হয়েছে।

এই ঘটনার মধ্যেই জেএনইউ-এর একাংশ শিক্ষক উপাচার্য শান্তিশ্রী ধুলিপুড়ি পণ্ডিতের অপসারণ দাবি করেছেন। তাঁদের অভিযোগ, বর্তমান প্রশাসন বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্রমশ একনায়কতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি করছে, যেখানে ভিন্ন মতের  কোনও জায়গা নেই।

একাধিক প্রাক্তন জেএনইউ ছাত্র—নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক—জানিয়েছেন, শাস্তির তীব্রতার পেছনে মূল কারণ ইউজিসি-র প্রস্তাবিত ‘ইকুইটি রুলস’-এর বিরুদ্ধে জেএনইউএসইউ-এর দৃঢ় অবস্থান। তাঁদের মতে, এই নিয়ম কার্যকর হলে সংরক্ষণ ও সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্নে বড়সড় পিছিয়ে যাওয়া ঘটতে পারে।

সাধারণ সম্পাদক সুনীল যাদব বলেন, “এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে ঠিক তার এক দিন পরেই, যেদিন আমরা ইউজিসি-র সেই নিয়ম নিয়ে ক্যাম্পাসে প্রতিবাদ কর্মসূচির ঘোষণা করেছিলাম, যেটি সুপ্রিম কোর্ট ইতিমধ্যেই স্থগিত রেখেছে।”

যদিও উচ্চবর্ণের বিভিন্ন গোষ্ঠীর আপত্তির জেরে ওই নিয়ম আপাতত স্থগিত রয়েছে, ছাত্র সংসদের নেতাদের আশঙ্কা—যে কোনও সময় তা ফের কার্যকর করার চেষ্টা হতে পারে। সেই কারণেই সংগঠিত প্রতিরোধ ভাঙতে পরিকল্পিতভাবে জেএনইউএসইউ-কে টার্গেট করা হয়েছে বলে তাঁদের দাবি।

দীর্ঘদিন ধরেই জেএনইউ প্রগতিশীল রাজনীতি ও তীব্র প্রতিবাদী সংস্কৃতির জন্য পরিচিত। ইউজিসি-র একাধিক বিতর্কিত নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলনে এই ক্যাম্পাস বরাবরই অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছে। জেএনইউ-র এক প্রাক্তন ছাত্র, যিনি বর্তমানে দিল্লির একটি কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, “যে ক্যাম্পাস একসময় বিতর্ক, আলোচনা আর মতবিনিময়ের প্রাণকেন্দ্র ছিল, আজ তা কার্যত কবরস্থানে পরিণত করা হয়েছে।”

তিনি আরও জানান, শাস্তি ঘোষণার ঠিক কয়েক দিন আগে আরএসএস-ঘনিষ্ঠ মুসলিম জাগরণ মঞ্চের প্রধান ইন্দ্রেশ কুমারের একটি সেমিনার ক্যাম্পাসে অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শীর্ষ আধিকারিক উপস্থিত ছিলেন। এই ঘটনার সঙ্গে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের সরাসরি যোগ আছে কি না, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তবে ডানপন্থী সংবাদমাধ্যম, বিশেষ করে ওপইন্ডিয়া-র আক্রমণাত্মক প্রচার ফের দেখিয়ে দেয়—বিষয়টি নিছক লাইব্রেরির ভাঙচুরে সীমাবদ্ধ নয়।

অনেকের মতে, জেএনইউ এখনও দেশের হাতে গোনা কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে একটি, যেখানে দীর্ঘদিন চেষ্টা করেও আরএসএস-বিজেপি তাদের আদর্শগত আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। সেই কারণেই এই ক্যাম্পাস আজও সমালোচনামূলক চিন্তা ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিরোধের প্রতীক—এবং সেই কারণেই শাসকগোষ্ঠীর চোখে এক অস্বস্তিকর চ্যালেঞ্জ।