আজকাল ওয়েবডেস্ক: ভারতে কি তবে বৈবাহিক বিশ্বস্ততার সংজ্ঞাই বদলে যাচ্ছে? মুখে আমরা যতই ‘হাম দো হামারে দো’ কিংবা পারিবারিক মূল্যবোধের কথা বলি না কেন, পর্দার আড়ালের চিত্রটা কিন্তু বেশ আলাদা। বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের জন্য জনপ্রিয় অ্যাপ ‘গ্লিডেন’ (Gleeden)-এর সাম্প্রতিক একটি সমীক্ষা আমাদের চেনা সামাজিক কাঠামোর ওপর এক বিরাট প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে। সমীক্ষার ফলাফল বলছে, ভারতে এই অ্যাপের গ্রাহক সংখ্যা বর্তমানে ৪০ লক্ষ ছাড়িয়ে গেছে, যা কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় বরং এক নিঃশব্দ সামাজিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত।
বিয়ের মতো পবিত্র বন্ধনে থেকেও বহু মানুষ এখন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের আশ্রয় নিচ্ছেন। উদ্দেশ্য—সামান্য সাহচর্য, আত্মতৃপ্তি কিংবা সম্পর্কের একঘেয়েমি থেকে মুক্তি। ২০২৪ সালে ভারতের টায়ার-১ এবং টায়ার-২ শহরের ২৫ থেকে ৫০ বছর বয়সী ১,৫০০ বিবাহিত নারী-পুরুষের ওপর একটি গবেষণা চালিয়েছিল গ্লিডেন। সেখানে দেখা গেছে, প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষ প্রথাগত সম্পর্কের বাইরে গিয়ে ‘সুইংগিং’ (পার্টনার অদলবদল) কিংবা ‘ওপেন রিলেশনশিপ’-এর মতো বিষয়গুলোতে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। শুধু গ্লিডেন নয়, অন্য একটি আন্তর্জাতিক অ্যাপ ‘অ্যাশলে ম্যাডিসন’-এর তথ্যও চমকে দেওয়ার মতো। ২০২৫ সালের জুন মাসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, তামিলনাড়ুর কাঞ্চিপুরমের মতো মন্দির ও সিল্ক শাড়ির জন্য পরিচিত ঐতিহ্যবাহী শহরটিও এখন পরকীয়া বা বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের অন্যতম হটস্পট হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মুম্বাইয়ের মার্কেটিং অ্যানালিস্ট স্নিগ্ধা ঘোষ (নাম পরিবর্তিত) মনে করেন, এগুলো এখন আর স্রেফ ব্যক্তিগত বিষয় নেই, অনেক ক্ষেত্রে ‘ওপেন সিক্রেট’। তিনি বলেন, “এখন অনেক সময় দেখা যায় স্ত্রী তার স্বামীর সম্পর্কের কথা জানেন, কিন্তু কোনও এক কারণে চুপ থাকেন। ওপেন ম্যারেজ বা উন্মুক্ত বিয়ের ধারণাটিও বেশ দ্রুত জনপ্রিয় হচ্ছে।” অন্যদিকে অনিরুদ্ধ (নাম পরিবর্তিত) নামে এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, তিনি স্রেফ রোমাঞ্চের খোঁজে গত ১২ বছরের দাম্পত্যের বাইরে গিয়ে এসব অ্যাপ ব্যবহার করেন।
গ্লিডেনের তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয় ব্যবহারকারীদের আচরণে কিছু নির্দিষ্ট ধরণ লক্ষ্য করা গেছে। মোট ব্যবহারকারীর ৬৫ শতাংশ পুরুষ এবং ৩৫ শতাংশ মহিলা। ভারতীয়রা দিনে গড়ে ১ থেকে ১.৫ ঘণ্টা এই অ্যাপে সময় কাটান। বিশেষ করে দুপুর ১২টা থেকে ৩টে এবং রাত ১০টা থেকে মাঝরাত পর্যন্ত অ্যাপে ভিড় সবচেয়ে বেশি থাকে। পছন্দের ক্ষেত্রে দেখা যায়, পুরুষরা সাধারণত ২৫-৩০ বছর বয়সী মহিলাদের খোঁজেন। অন্যদিকে, মহিলারা ৩০-৪০ বছর বয়সী আর্থিকভাবে সচ্ছল পেশাদারদের, যেমন ডাক্তার, চাটার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট বা বড় পদের কর্মকর্তাদের বেশি পছন্দ করেন।
বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের এই ঝোঁক শুধু দিল্লি-মুম্বাইয়ের মতো মেট্রো শহরেই সীমাবদ্ধ নেই। তালিকায় শীর্ষে আছে বেঙ্গালুরু (১৮%), হায়দ্রাবাদ (১৭%), এবং দিল্লি (১১%)। তবে লক্ষ্ণৌ, চণ্ডীগড়, সুরাট, কোয়েম্বাটোর, পাটনা এবং গুয়াহাটির মতো ছোট শহরগুলো থেকেও বিপুল সংখ্যক মানুষ এখন এই তালিকায় নাম লেখাচ্ছেন। সবচেয়ে লক্ষ্যণীয় বিষয় হল মহিলাদের অংশগ্রহণের হার। গত দুই বছরে এই অ্যাপে মহিলা ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১৪৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
গ্লিডেনের ইন্ডিয়া কান্ট্রি ম্যানেজার সিবিল শিডেল একে এক ‘নিঃশব্দ বিপ্লব’ হিসেবে দেখছেন। তার মতে, মহিলারা এখন নিজেদের আবেগ ও ব্যক্তিগত পছন্দের ব্যাপারে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী এবং স্বাধীন। তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—এই বৃদ্ধি কি নারীর ক্ষমতায়নের প্রতিফলন, নাকি বর্তমান দাম্পত্য সম্পর্কের ভেতরে থাকা গভীর শূন্যতা বা অপূর্ণ আবেগের বহিঃপ্রকাশ? তর্ক-বিতর্ক চলতে পারে, কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে, একবিংশ শতাব্দীর ভারত তার সম্পর্কের সমীকরণগুলো অত্যন্ত গোপনে অথচ দৃঢ়ভাবে বদলে ফেলছে। বিবাহ নামক প্রতিষ্ঠানটি টিকে থাকলেও, তার ভেতরে মানুষের আনুগত্যের সংজ্ঞাটি আগের চেয়ে অনেক বেশি নমনীয় হয়ে উঠছে।
















