আজকাল ওয়েবডেস্ক: ভারতের ঐতিহ্য, ইতিহাস ও আদিকালের প্রযুক্তি এই জাহাজের সঙ্গে। বলা চলে আদি ভারতের প্রযুক্তিগত নৈপুন্যের সঙ্গে এক্ষেত্রে হাত ধরাধরি করে চলেছে আধুনিকতা। আর এভাবেই, ভারতের প্রাচীন সমুদ্রযাত্রা ও নৌবহরের ঐতিহ্য ও ইতিহাসের সংশ্লেষ ঘটিয়ে এক নতুন যাত্রাপথ তৈরি করে  ওমানের মাস্কট বন্দরে পৌঁছল ভারতীয় নৌবাহিনীর বিশেষ জাহাজ INSV কৌণ্ডিন্য। গুজরাটের পোরবন্দর থেকে শুরু হওয়া এই ১৮ দিনের দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রা শুধুমাত্র একটি নৌ অভিযান নয়, বরং দেড় হাজার বছরেরও বেশি পুরনো ভারতীয় নৌযাত্রার ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে বর্তমানের নৌবহরে ফিরিয়ে আনার এক ব্যতিক্রমী প্রচেষ্টা।

এই উপলক্ষে ওমানে ভারতীয় দূতাবাসে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সঞ্জীব সান্যাল জানান, প্রকল্পটি কেবলই আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের লক্ষ্যে ব্যবহৃত হয়নি , বরং প্রাচীন ভারতের ‘স্টিচড শিপ’ বা সেলাই করা নৌকা নির্মাণ পদ্ধতিকে বাস্তবে প্রয়োগ করতে চেয়েছে। তিনি বলেন, অজন্তা গুহার পঞ্চম শতকের একটি চিত্রকর্মে আঁকা জাহাজ থেকেই এই ভাবনার সূচনা। প্রথমে সেই চিত্রের ভিত্তিতে একটি রেখাচিত্র তৈরি করা হয়, তারপর তা মিলিয়ে দেখা হয় ভারতের প্রাচীন নৌকা নির্মাণ ঐতিহ্য ও আরব অঞ্চলের এমনই এক প্রচেষ্টার সঙ্গে।

এই প্রক্রিয়ায় আলোচনায় আসে প্রায় ১৫ বছর আগে নির্মিত ওমানের ঐতিহাসিক জাহাজ ‘জুয়েল অফ মাস্কট’। সেই জাহাজের সংরক্ষক ক্যাপ্টেন সালেহের কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও দিকনির্দেশ পাওয়া যায়। একই সময়ে ঘটনাচক্রে নৌস্থপতি কমান্ডার হেমন্ত কুমারের সঙ্গে পরিচয় হয় সঞ্জীব সান্যালের, যিনি পরে জাহাজটির নকশা তৈরিতে এবং সমুদ্রযাত্রার সময় ক্রু হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

প্রাথমিক নকশায় তিন মাস্তুল থাকলেও ব্যবহারিক কারণে তা কমিয়ে দুই মাস্তুল করা হয়। শেষ পর্যন্ত তৈরি হয় প্রায় ২১ মিটার লম্বা, ৬.৫ মিটার চওড়া এবং ৩.৩ মিটার গভীর একটি জাহাজ, যার ওজন প্রায় ৫০ টন এবং যা ১৮ জন ক্রু নিয়ে চলাচলে সক্ষম। এই জাহাজে নেই কোনও ইঞ্জিন, নেই লোহার পেরেক বা আধুনিক ধাতব যন্ত্রাংশ। কাঠের তক্তাগুলি নারকেলের ছোবড়া থেকে তৈরি দড়ি দিয়ে সেলাই করা হয়েছে এবং জল আটকাবার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে প্রাকৃতিক রেজিন, তুলো ও তেল। এই নির্মাণ পদ্ধতি ‘টাংকাই মেথড’ নামে পরিচিত, যা ঢেউয়ের ধাক্কা সামলাতে সাহায্য করে।

২০২৩ সালের জুলাই মাসে সংস্কৃতি মন্ত্রক, ভারতীয় নৌবাহিনী এবং হোডি ইনোভেশনস-এর যৌথ উদ্যোগে এই প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। কেরলের কারিগরদের একটি দল, মাস্টার শিপরাইট বাবু শংকরনের নেতৃত্বে, হাতে-হাতে জাহাজটি নির্মাণ করেন। কোনও সংরক্ষিত নকশা না থাকায় ভারতীয় নৌবাহিনী ভিজ্যুয়াল সূত্র ও বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার মাধ্যমে জাহাজটির নিরাপত্তা এবং যাতে এটি টেকসই হয়, সেবিষয়ে  নিশ্চিত করে। আইআইটি মাদ্রাজে হাইড্রোডাইনামিক পরীক্ষার পর ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাহাজটি জলে নামানো হয় এবং মে মাসে কর্ণাটকের কারওয়ারে আনুষ্ঠানিকভাবে নৌবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

এরপর ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ পোরবন্দর থেকে মাস্কটের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে INSV কৌণ্ডিন্য। চার অফিসার ও ১৩ জন নৌসেনা মিলিয়ে মোট ১৭ জনের একটি দল এই অভিযানে অংশ নেয়। অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন কমান্ডার বিকাশ শেওরণ, অফিসার-ইন-চার্জ ছিলেন কমান্ডার হেমন্ত কুমার। ১৮ দিনের যাত্রাপথে ঝড়, বৃষ্টি ও উত্তাল সমুদ্রের মুখোমুখি হলেও একই সঙ্গে দেখা মেলে মনোমুগ্ধকর সূর্যোদয় ও চাঁদের আলোয় স্নান করা সমুদ্রের দৃশ্য। নিজেও এই অভিযানের অংশ ছিলেন সঞ্জীব সান্যাল, যিনি একে তাঁর পাঁচ বছরের স্বপ্নপূরণ বলে বর্ণনা করেন এবং ভারতীয় নৌসেনাদের দক্ষতার ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি এই বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ব্যক্তিগত উৎসাহ এবং নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধানের কথাও উল্লেখ করেন।

INSV কৌণ্ডিন্য নামকরণ করা হয়েছে প্রথম শতকের ভারতীয় নাবিক কৌণ্ডিন্যের নামে, যিনি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় গিয়ে ফুনান রাজ্যের প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখেছিলেন বলে ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে। জাহাজটিতে ব্যবহৃত প্রতীকগুলিও ভারতের সমুদ্র যাত্রার অতীতের সঙ্গে যুক্ত, কদম্ব রাজবংশের গণ্ডভেরুণ্ড, পালজুড়ে সূর্যচিহ্ন, নৌকার অগ্রভাগে সিংহ এবং হরপ্পা যুগের আদলে তৈরি পাথরের নোঙর।

ভারত থেকে ওমান এবং সেখান থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, এই সমুদ্রপথ এক সময় ছিল বাণিজ্য, সংস্কৃতি ও ভাবনার আদানপ্রদানের প্রধান সেতু। INSV কৌণ্ডিন্য সেই হারিয়ে যাওয়া সমুদ্রপথে আবার পাল তুলে প্রমাণ করল, প্রাচীন ভারতের সমুদ্র বিজ্ঞান  শুধু ইতিহাসের পাতায় নয়, আজও সমুদ্রের বুকে কার্যকর ও প্রাসঙ্গিক।