আজকাল ওয়েবডেস্ক: শুকিয়ে মরার অপেক্ষায় পরিকিস্তান! চেনাব নদীর উপর বাঁদ নির্মাণ দ্রুত সম্পন্ন করার নির্দেশ দিয়েছে ভারত সরকার। ফলে পাকিস্তানের লাইফ-লাইনে ভারতের নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠার বিষয়টি আর কোনও কৌশলগত ধারণা নয়, তা ক্রমশ বাস্তব রূপ নিতে চলেছে।
কেন্দ্রের তরফে সরকারি আধিকারিকদের পাকাল দুল এবং কিরু প্রকল্প দু'টি ডিসেম্বর ২০২৬ সালের মধ্যে চালু করতে, কোয়ার প্রকল্প মার্চ ২০২৮ সালের মধ্যে সম্পন্ন করতে এবং কৌশলগতভাবে সংবেদনশীল রাতলে বাঁধের নির্মাণকাজ ত্বরান্বিত করতে বলা হয়েছে। বিদ্যুৎমন্ত্রী মনোহর লাল খট্টরের দুই দিনের পরিদর্শনের পরেই এই পদক্ষেপ করা হয়েছে। তিনি জম্মু ও কাশ্মীরের একাধিক বাঁধ প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যালোচনা করেছেন এবং জোর দিয়ে বলেছেন যে- সময়সীমা মেনেই বাঁধ নির্মাণ কার্যকর করা হবে।
চেনাবের উপর বাঁধ নির্মাণের সঙ্গে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনেরই সম্পর্ক নয়, তার চেয়েও অনেক বেশি কিছু জড়িত। চেনাব নদী সিন্ধু অববাহিকার একটি অংশ — যা পাকিস্তানের জীবনরেখা। পাকিস্তানের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ জল আসে পশ্চিম দিয়ে প্রবাহিত এই নদীগুলো থেকে, যা ভারত থেকে পাকিস্তানে প্রবাহিত হয়।
পাকিস্তানের ৯০ শতাংশেরও বেশি কৃষি এই অববাহিকার উপর নির্ভরশীল। এর নদীগুলোর উপর সব বাঁধ ও খালের নেটওয়ার্ক এই অববাহিকাকে কেন্দ্র করেই নির্মিত। কার্যত, দশজনের মধ্যে নয়জন পাকিস্তানিই নির্ভর করে এইসব নদীর উপর, যা প্রথমে ভারতীয় ভূখণ্ডের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়। এই বাস্তবতা ব্যাখ্যা করে যে, কেন চেনাবে সংক্রান্ত প্রতিটি পদক্ষেপ সীমান্তের ওপার থেকে এত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়।
এই প্রকল্পগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল কিশতওয়ারে অবস্থিত পাকাল দুল জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। ১,০০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন এই প্রকল্প চেনাব অববাহিকার বৃহত্তম প্রকল্প। সেই সঙ্গেই ১৬৭ মিটার উচ্চতার এই প্রকল্পটি ভারতের সর্বোচ্চ বাঁধ। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল, পাকাল দুল জলবিদ্যুৎ প্রকল্পটি পাকিস্তানের দিকে প্রবাহিত পশ্চিমের নদীর উপর ভারতের প্রথম জল সংরক্ষণ প্রকল্প। চেনাবের একটি উপনদীর উপর নির্মিত এই প্রকল্পটি ২০১৮ সালের মে মাসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি উদ্বোধন করেছিলেন। সিন্ধু জলচুক্তি স্থগিত থাকায়, কেন্দ্র এখন পাকাল দুল প্রকল্পটিকে ডিসেম্বর ২০২৬ সালের মধ্যে চালু করার নির্দেশ দিয়েছে। এটি চালু হলে, ভারত কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদনই নয়, জলপ্রবাহের সময় নিয়ন্ত্রণেরও ক্ষমতা পাবে। ফলে পাকিস্তান দীর্ঘকাল ধরেই উদ্বিগ্ন।
পাশাপাশি চলছে কিরু প্রকল্প, যা কিশতওয়ার জেলাতেই অবস্থিত। চেনাব নদীর উপর ১৩৫ মিটার উঁচু কিরু বাঁধটি একটি রান-অফ-দ্য-রিভার প্রকল্প, কিন্তু এর কৌশলগত গুরুত্ব নিহিত রয়েছে উজানে ও ভাটিতে থাকা প্রকল্পগুলোর একটি শৃঙ্খলের সঙ্গে এর সমন্বয়ের মধ্যে। কেন্দ্র কিরু প্রকল্পের জন্যও ২০২৬ সালের ডিসেম্বর মাসকে সময়সীমা নির্ধারণ করেছে, যা থেকে স্পষ্ট যে- এই দু'টি প্রকল্পই একই সঙ্গে চালু হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এই উদ্যোগের তৃতীয় স্তম্ভ হল কোয়ার প্রকল্প, যা চেনাব নদীর উপর ১০৯ মিটার উঁচু আরেকটি রান-অফ-দ্য-রিভার বাঁধ। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে একটি বড় প্রকৌশলগত মাইলফলকটি অর্জিত হয়। এই বাঁধ নির্মাণের জন্য চেনাব নদীর গতিপথ সফলভাবে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়। এই নদীপথ পরিবর্তনকে পাকিস্তান নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছিল। কেন্দ্র এখন নির্দেশ দিয়েছে যে, কোয়ার প্রকল্প ২০২৮ সালের মার্চের মধ্যে চালু করতে হবে, যার ফলে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারিত হয়েছে।
এরপর রয়েছে রাতলে প্রকল্প, যা সম্ভবত এই সব প্রকল্পের মধ্যে সবচেয়ে বিতর্কিত। ৮৫০ মেগাওয়াটের এই প্রকল্পে চেনাব নদীর উপর একটি ১৩৩ মিটার উঁচু বাঁধ নির্মাণ করা হবে এবং পাকিস্তান বছরের পর বছর ধরে এর বিরোধিতা করে আসছে, বিশেষ করে এর স্পিলওয়ের নকশা নিয়ে। তাঁর সাম্প্রতিক সফরে কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎমন্ত্রী বাঁধের কংক্রিটের কাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছেন। যা থেকে বোঝা যায় যে- রাতলে প্রকল্পকে এখন দ্রুতগতিতে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এই প্রকল্পের জন্য ২০২৪ সালে সুড়ঙ্গের মাধ্যমে চেনাব নদীর গতিপথ পরিবর্তন করা হয়েছিল এবং আশা করা হচ্ছে যে- বাঁধটি ২০২৮ সালের মধ্যে প্রস্তুত হয়ে যাবে।
এই প্রধান প্রকল্পগুলো ছাড়াও, ভারত চেনাব নদীর উপর দুলহস্তি স্টেজ-২ প্রকল্প নিয়েও এগিয়ে যাচ্ছে। প্রকল্পটি গত ডিসেম্বরে পরিবেশ মন্ত্রক প্যানেল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছে এবং এটি ইতিমধ্যেই চালু থাকা দুলহস্তি-১ প্রকল্পের পরে নির্মিত হবে। পাকিস্তান সম্প্রতি এই ছাড়পত্রের বিষয়েও আপত্তি জানিয়েছে এবং বলেছে যে- তাদের এ বিষয়ে অবহিত করা হয়নি। যদিও ভারত এই আপত্তি প্রত্যাখ্যান করেছে।
