আজকাল ওয়েবডেস্ক: প্রবল বৃষ্টির পর শনিবার ভোর থেকেই দিল্লি ও সংলগ্ন অঞ্চলে ঘন কুয়াশা ও মেঘলা আবহাওয়া দেখা গিয়েছে। শুক্রবার রাজধানী জুড়ে গত ছ’বছরের মধ্যে সবচেয়ে শীতলতম মার্চের দিন দেখার পরই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
শনিবার সকাল প্রায় সাড়ে সাতটার সময় সাফদারজং পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে তাপমাত্রা ছিল ১৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বাতাসে আর্দ্রতার মাত্রা ছিল ১০০ শতাংশ, ফলে চারপাশে ঘন কুয়াশা দেখা গিয়েছে এদিন।
তবে আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে, এদিনের জন্য দিল্লি ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় কোনও বিশেষ সতর্কতা জারি করা হয়নি। এর আগে শুক্রবার বজ্রবিদ্যুৎ সহ ঝড় এবং বৃষ্টির জন্য হলুদ সতর্কতা জারি করেছিল আবহাওয়া দপ্তর।
সক্রিয় পশ্চিমী ঝঞ্ঝার প্রভাবে হওয়া এই বৃষ্টিতে রেকর্ড তাপমাত্রা থেকে আপাতত স্বস্তি মিলেছে। উত্তরপ্রদেশের একাধিক জেলাতেও ঝোড়ো হাওয়া, বজ্রবিদ্যুৎ সহ বৃষ্টির প্রভাব দেখা গেছে।
শুক্রবার দিল্লিতে গত ছ’বছরের মধ্যে মার্চ মাসের সবচেয়ে শীতলতম দিন হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রায় পাঁচ মাসের মধ্যে সবচেয়ে পরিষ্কার বাতাসও পাওয়া যায়। বায়ুর সূচক অর্থাৎ একিউআই নেমে আসে ৯৩-এ। যা ‘সন্তোষজনক’ পর্যায়ে পড়ে।
এর আগে শেষবার ২০২৫ সালের ৯ অক্টোবর এই মান ‘সন্তোষজনক’ স্তরে ছিল। চলতি মার্চ মাস গত তিন বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাতের সাক্ষী হয়েছে।
এর আগে ২০২৩ সালে মার্চ মাসে সর্বাধিক ৫০.৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছিল দিল্লিতে। আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে, উত্তর পাকিস্তান থেকে মধ্যপ্রদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত সক্রিয় পশ্চিমী ঝঞ্ঝা এবং হরিয়ানা ও দক্ষিণ উত্তরপ্রদেশের উপর ঘূর্ণাবর্তের প্রভাবেই এই আবহাওয়ার পরিবর্তন হয়েছে।
উল্লেখ্য, এই বিরল পরিস্থিতির পেছনে রয়েছে একটি অদ্ভুত ধরনের ‘পশ্চিমী ঝঞ্ঝা’, যা স্বাভাবিক নিয়ম ভেঙে নতুন ধরণের আবহাওয়া তৈরি করছে।
এই বিশেষ আবহাওয়া ব্যবস্থা প্রায় ১,০০০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি সরলরেখার মতো নিম্নচাপ অঞ্চল তৈরি করেছে, যা আফগানিস্তান থেকে পাকিস্তান পেরিয়ে ভারতের গভীরে প্রবেশ করেছে।
সাধারণত, এটি ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে সৃষ্টি হওয়া নিম্নচাপ থেকে উৎপন্ন হয়ে উত্তর-পূর্ব দিকে বেঁকে আসে এবং শীতকালে তুষারপাত ও ঠান্ডা হাওয়া নিয়ে আসে। কিন্তু এবারের ঘটনায় দেখা যাচ্ছে, এটি একটি সরল ট্রাফ বা রেখার মতো বিস্তৃত—যা আবহাওয়ার অস্থিরতার নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করছে।
বর্তমানে উত্তর পাকিস্তানের উপর একটি উপরের স্তরের ঘূর্ণাবর্ত সক্রিয় রয়েছে, যা উত্তর-পশ্চিম ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপক প্রভাব ফেলছে। এর ফলে ঘণ্টায় ৪০ থেকে ৮০ কিলোমিটার বেগে দমকা হাওয়া, বজ্রঝড়, শিলাবৃষ্টি এবং হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টিপাত হচ্ছে।
এর প্রভাব ইতিমধ্যেই ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে স্পষ্ট। উপ-হিমালয় সংলগ্ন পশ্চিমবঙ্গ ও সিকিমে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে। দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটক, অন্ধ্রপ্রদেশ, কেরল ও তামিলনাড়ুতেও ভারী বৃষ্টি দেখা গেছে। একাধিক রাজ্যে শিলাবৃষ্টির খবরও মিলেছে, যা কৃষিক্ষেত্রে ক্ষতির আশঙ্কা বাড়িয়েছে।
এই পশ্চিমী ঝঞ্ঝার গঠনও বেশ জটিল। এটি উপরের বায়ুমণ্ডলের ট্রাফের সঙ্গে যুক্ত থেকে নিচের স্তরের একাধিক ঘূর্ণাবর্তের সঙ্গে মিশে গেছে। মধ্যপ্রদেশের উত্তরাংশ, পূর্ব উত্তরপ্রদেশ, পশ্চিম রাজস্থান, হরিয়ানা, উত্তর-পূর্ব অসম এবং দক্ষিণ ভারতের কিছু অংশে এই ঘূর্ণাবর্তগুলি সক্রিয় রয়েছে, যা আবহাওয়াকে আরও অস্থির করে তুলছে।
এই বিরল আবহাওয়ার পেছনে আর্দ্রতার উৎসও বিস্তৃত। ভূমধ্যসাগর, কাস্পিয়ান সাগর, কৃষ্ণ সাগর এবং পারস্য উপসাগর থেকে জলীয় বাষ্প উঠে এই সিস্টেমে যোগ হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্য পেরিয়ে আসার সময় আরব সাগর থেকেও অতিরিক্ত আর্দ্রতা যুক্ত হচ্ছে, যা হিমালয়ের পাহাড়ে ধাক্কা খেয়ে বৃষ্টিপাতকে আরও তীব্র করছে।
