আজকাল ওয়েবডেস্ক: এরকম ভয়ঙ্কর কিছু ঘটতে পারে তা স্বপ্নেও  কেউ ভাবতে পারেনি। হাড়হিম হত্যাকাণ্ড রাজস্থানে। ফিরল মেঘালয়ে মধুচন্দ্রিমা হত্যার স্মৃতি। মেঘালয়ে মধুচন্দ্রিমায় গিয়েছিলেন রাজা রঘুবংশী ও তাঁর স্ত্রী সোনম। সেখানে নিজের প্রেমিকের সঙ্গে মিলে সোনম পরিকল্পনা করে দুর্ঘটনার মোড়কে রাজাকে খুন করেন। জলপ্রপাতের কাছে গিয়ে রাজার খাদে ফেলে দেওয়া হয়। রাজস্থানের ঘটনাও অনেকটা সেরকমই। এক্ষেত্রে প্রেমিকের সঙ্গে মিলে স্বামীকে হত্যার পর হিট অ্যান্ড রানের তত্ত্ব খাড়া করা হয়েছিল। তবে তা ধোপে টেঁকেনি।

জেলার সাদুলশহরের বাসিন্দা ২৩ বছর বয়সী অঞ্জলি তিন মাস আগে পাকিস্তান সীমান্ত থেকে মাত্র ৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ১-কেএলএম গ্রামের ২৭ বছর বয়সী আশীষকে বিয়ে করেন। কাগজে-কলমে এই সম্পর্কটি নিখুঁত মনে হয়েছিল। আশীষ ভূতত্ত্বে এমএসসি সম্পন্ন করে বিএড ডিগ্রি করছিলেন। অঞ্জলি এমকম পড়েন। সবচেয়ে বড় কথা হল, অঞ্জলি ও আশীষের পরিবারের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। একে অপরকে সকলে চিনতেন। এমনকী এই দুই পরিবারের মধ্যে আগেও বিয়ে হয়েছে। 

সন্তান না থাকায় ছোটবেলায় আশীষকে তার কাকা ও কাকী দত্তক নিয়েছিলেন। তাঁরা তাঁকে খুব ভালোবেসেই বড় করেছিলেন এবং কয়েক মাস আগে তাঁর পালিকাক মা নিজের ভাগ্নি অঞ্জলির সঙ্গে ছেলের বিয়ের ব্যবস্থা করেন।

বৃহস্পতিবার সংবাদ মাধ্যমকে আশীষের পরিবারের সদস্যরা জানান যে, অঞ্জলি তাঁদের সঙ্গে বেশ ভালোভাবে মানিয়ে নিচ্ছিল। তাই ৩০শে জানুয়ারির ঘটনায় তাঁরা আরও আরও বেশি হতবিহ্বল ও স্তম্ভিত হয়ে পড়েন।

সেদিন সন্ধ্যায় অঞ্জলি ও আশীষ, তাঁদের খুরতুতো ভাই অঙ্কিত এবং তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে হাঁটতে বেরিয়েছিলেন। অঙ্কিত বলেন, "আমরা আমাদের নিয়মিত হাঁটার জন্য গ্রামের দিকে গিয়েছিলাম। আমরা সাধারণত নির্জন রাস্তা দিয়ে হাঁটি না। কিন্তু আশীষ আমাকে এবং আমার স্ত্রীকে বাড়িতে নামিয়ে দেয় এবং তারপর অঞ্জলির পীড়াপীড়িতে তাঁরা সেই রাস্তা ধরেছিল।"

পরে পরিবারকে জানানো হয় যে, আশীষ ও অঞ্জলিকে একটি হিট-অ্যান্ড-রান দুর্ঘটনার শিকার হিসেবে অচেতন অবস্থায় পাওয়া গিয়েছে। কমিউনিটি স্বাস্থ্য কেন্দ্রে আশীষকে মৃত ঘোষণা করা হয়। আর অঞ্জলি বলেছিলেন যে, দুর্ঘটনার পর তার সোনার গয়না চুরি হয়ে গিয়েছিল। ওঁর বারবার জ্ঞান ফিরছিল, আবার অচেতন হয়ে পড়ছিলেন।

তবে আশীষের শরীরের আঘাত, অঞ্জলির গল্পের অসঙ্গতি ধরে ফেলে পুলিশ। পুলিশের পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তে প্রকাশ পায় যে, এই মৃত্যু কোনও দুর্ঘটনা ছিল না, বরং নববিবাহিতা পরিকল্পিত একটি হত্যাকাণ্ড। জানা গিয়েছে, অঞ্জলি তাঁর প্রাক্তন প্রেমিক সঞ্জুর সঙ্গে বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন। সঞ্জু বিয়ের অনুষ্ঠানে ওয়েটারের কাজ করেন।

সঞ্জু এবং তাঁর দুই বন্ধু রাস্তার ধারের ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে ছিল এবং অঞ্জলি ও আশীষ সেখানে পৌঁছালে তাঁরা আশীষের ওপর হামলা করে। আশীষকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। ঘটনাটিকে একটি সড়ক দুর্ঘটনা বলে চালানোর চেষ্টা করা হয়। পুলিশ আসার পর অঞ্জলি তাঁর কানের দুল সঞ্জুকে দিয়ে দেয়, শুয়ে পড়ে এবং অজ্ঞান হওয়ার ভান করে।

‘মৃত্যুদণ্ড দেওয়া উচিত’
আশীষের গ্রামে মানুষজন এখনও বিয়ের জাঁকজমক ভুলতে পারেননি। এই হত্যার ঘটনা সামনে আসতেই সকলে হতবাক ও ক্ষুব্ধ। আশীষের বাবা রামরখ অঞ্জলির মৃত্যুদণ্ডের দাবি জানিয়েছেন, আর মা এতটাই শোকে মুহ্যমান যে কথা বলার অবস্থাতেই ছিলেন না।

রামরখ স্মরণ করে বলেন, "অঞ্জলির আচরণ সবসময় স্বাভাবিকই মনে হত। সে পরিবারের সবার সঙ্গে ভালোভাবে মিশে গিয়েছিল। খুনের পর সে অজ্ঞান হওয়ার ভান করে এবং আমাদের সঙ্গে কোনও কথা বলেনি।" ক্ষোভের সুরে তিনি আরও বলেন, "আমরা চাই ওকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হোক। এমনকী ওর পরিবারও আমাদের সঙ্গে একমত।"

ক্ষোভ ও লজ্জা
সাদুলশহরের ছাজগাড়িয়া মহল্লার পরিস্থিতিও খুব একটা ভাল না, এখানেই অঞ্জলির পরিবার প্রায় ৪০ বছর ধরে বসবাস করছে। অঞ্জলির বাবা ১৩ বছর আগে প্রয়াত হ। তাঁর মা, দুই ভাই পরিবার নিয়ে একসঙ্গে থাকেন। আশীষের সঙ্গে বিয়ের পর সে এমকম ডিগ্রির পড়াশোনার অজুহাতে কিছুদিন বাড়িতে ফিরে এসেছিল।

প্রতিবেশীরা জানান, অঞ্জলি প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে শ্রী গঙ্গানগর শহরে সঞ্জুর সঙ্গে দেখা করত এবং পরিবার হয়তো তাদের সম্পর্কের কথা জানত। সকলের ধারণা, আশীষের সঙ্গে বিয়েটা হয়তো অঞ্জলির পরিবার সঞ্জুকে ভুলিয়ে দেওয়ার জন্যই দিয়েছিল, কিন্তু বিয়ের পর বাড়ি ফিরে অঞ্জলি আবার তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করে।

তবে অঞ্জলির কাকা এই ধারণাটি অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, "আমরা বিধ্বস্ত। আমরা ৫০ বছর ধরে এই পরিবারের সঙ্গে যুক্ত। আমাদের প্রথা এমন যে, আমরা নিশ্চিত করি আমাদের মেয়েরা যেন শুধু পরিচিত পরিবারেই বিয়ে করে। আমার দুই বোনও ওই পরিবারেরই অংশ। এই সম্পর্ক সম্পর্কে আমাদের কোনও ধারণাই ছিল না। আমরা গভীরভাবে লজ্জিত। যদি আমরা জানতাম, তাহলে এই বিয়ে হতে দেওয়ার চেয়ে আমরা মরে যেতাম।"  

তিনি আক্ষেপ করে আরও বলেন, "অঞ্জলি আমার ভাইঝি। ওর বাবা প্রায় ১৩ বছর আগে মারা গিেছেন। আমরা চাই অঞ্জলি এবং ওই তিনজনের মৃত্যুদণ্ড হোক। আশীষ যেভাবে কষ্ট পেয়ে মারা গিয়েছে... ওদেরও একই শাস্তি হওয়া উচিত। সে আমাদের ধ্বংস করে দিয়েছে। আমরা জানি না কীভাবে মানুষের সামনে মুখ দেখাব।" 

'অসম সম্পর্ক'
আশীষের পরিবার সচ্ছল ছিল। বিয়েতে অনেকগুলো দামি গাড়ি এসেছিল। যা দেখে প্রতিবেশীরাও অবাক হয়েছেন যে, অঞ্জলি কীভাবে অশিক্ষিত এবং কোনোমতে দিন গুজরান করা সঞ্জুর সঙ্গে থাকার জন্য আশীষকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নিল।

পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সঞ্জু কয়েক বছর আগে তাঁর বাবাকে হারিয়েছে এবং তাঁর দুই ভাই ও দুই বোন রয়েছে। একজন পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, "সে বিয়ে এবং অন্যান্য অনুষ্ঠানে ক্যাটারিং সার্ভিসের ওয়েটার হিসেবে কাজ করে। তাঁর কোনও অপরাধমূলক রেকর্ড ছিল না, তবুও সে তাঁর বন্ধু রোহিত ওরফে রকি এবং বাদল একসঙ্গে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে।"