আজকাল ওয়েবডেস্ক: পাঁচ বছর আগে জাতীয় শিক্ষা নীতি (NEP) ২০২০ যে একক উচ্চশিক্ষা নিয়ন্ত্রকের ধারণা সামনে এনেছিল, সেই পরিকল্পনাকে বাস্তব রূপ দিতে কেন্দ্রীয় সরকার এবার শীতকালীন অধিবেশনে উচ্চশিক্ষা কমিশন অব ইন্ডিয়া (HECI) বিল ২০২৫ সংসদে পেশ করতে চলেছে। এই বিলের লক্ষ্য দেশের উচ্চশিক্ষা কাঠামোয় থাকা একাধিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা—UGC, AICTE এবং NCTE—কে বাতিল করে একক নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠা করা এবং উচ্চশিক্ষার স্বীকৃতি, নিয়ন্ত্রণ ও মান-নির্ধারণের প্রক্রিয়াকে পুনর্গঠিত করা।
এই উদ্যোগের সূত্রপাত ২০১৮ সালে প্রথম HECI খসড়া বিলের মাধ্যমে। সেই বিলের উদ্দেশ্য ছিল UGC আইন রদ করা এবং উচ্চশিক্ষার নিয়ন্ত্রণ একত্রিত করা। তবে সেই সময় AICTE ও NCTE-কে একত্রিত করার প্রস্তাব ছিল না এবং বিলটি কঠোর কেন্দ্রীকরণের অভিযোগে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে। বিশ্ববিদ্যালয় স্বায়ত্তশাসন সংকুচিত হবে—এমন আশঙ্কা উঠেছিল এবং শেষ পর্যন্ত বিলটি প্রত্যাহার করা হয়।
এরপর ২০২১ সালে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের নেতৃত্বে উদ্যোগটি পুনরায় তোলা হয়। এবার NEP 2020–এর সুপারিশ অনুযায়ী প্রস্তাবটি সাজানো হয়। নীতিতে বর্তমান উচ্চশিক্ষা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে ভারী, দ্বৈত ক্ষমতার এবং স্বার্থসঙ্কটপূর্ণ বলে বর্ণনা করে বলা হয় যে বহুস্তরীয় প্রশাসনিক জটিলতা মানোন্নয়নের পথে বাধা সৃষ্টি করেছে। তাই একক নিয়ন্ত্রক, স্বচ্ছ স্বীকৃতি ব্যবস্থা এবং পরিষ্কার ক্ষমতা-বণ্টনের ওপর জোর দেওয়া হয়।
বর্তমান কাঠামো অনুযায়ী, UGC অ-প্রযুক্তিগত শিক্ষা, AICTE প্রযুক্তিগত শিক্ষা এবং NCTE শিক্ষক প্রশিক্ষণ ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ করে। নতুন বিল এই তিন প্রতিষ্ঠানকে একসঙ্গে করে HECI গঠন করতে চায়, যা উচ্চশিক্ষাকে স্ব-শাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে উন্নত করবে এবং স্বচ্ছতা, মান এবং উদ্ভাবনের পরিবেশ তৈরি করবে—এমন দাবি সরকারি সূত্রের।
নতুন কাঠামোয় HECI ছোট কিন্তু বিশেষজ্ঞ-নেতৃত্বাধীন সংস্থা হিসেবে কাজ করবে এবং এর অধীনে থাকবে চারটি পৃথক শাখা বা ভ্যার্টিক্যাল। এগুলির মধ্যে রয়েছে—জাতীয় উচ্চশিক্ষা নিয়ন্ত্রক পরিষদ (নিয়ন্ত্রণের জন্য), জাতীয় স্বীকৃতি পরিষদ (স্বীকৃতির জন্য), সাধারণ শিক্ষা পরিষদ (শিক্ষাগত মান নির্ধারণের জন্য) এবং উচ্চশিক্ষা অনুদান পরিষদ (ফান্ডিং-এর জন্য)। যদিও NEP এই পরিষদের অধীনে তহবিল গঠনের স্বাধীনতা দেওয়ার প্রস্তাব করে, বাস্তবে অর্থ বরাদ্দ ক্ষমতা মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রকেই থাকার সম্ভাবনা প্রবল।
এই প্রস্তাব অনুযায়ী, চিকিৎসা ও আইন শিক্ষা এই কাঠামোর বাইরে থাকবে। তবে বাকি সব উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে একই নিয়ন্ত্রক কাঠামোর আওতায় আনতে চাওয়া হচ্ছে। সরকারের বক্তব্য—এতে অনুমোদন প্রক্রিয়া দ্রুত হবে, প্রশাসনিক জট কমবে, মানদণ্ড সারা দেশে সমান হবে এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভারতের উচ্চশিক্ষার গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে।
তবে সমালোচনার তালিকাও কম নয়। পূর্ববর্তী খসড়ায় যেমন, নতুন কাঠামোতেও রাজ্য সরকারের ভূমিকা কতটা থাকবে তা এখনো অস্পষ্ট। সংসদীয় কমিটি ইতিমধ্যেই সতর্ক করেছে—কেন্দ্র–রাজ্য নিয়ন্ত্রণের দ্বন্দ্ব বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে জটিলতার মুখে ফেলতে পারে। তাছাড়া উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন তুলে সমালোচকরা বলেছেন—মহিলা, দলিত, আদিবাসী, সংখ্যালঘু, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী এবং প্রতিবন্ধী সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ এখনও স্পষ্ট নয়, অথচ বেসরকারি এবং শিল্প সংস্থার উপস্থিতি শুরু থেকেই নিশ্চিত করা হয়েছে। ফলে শিক্ষানীতি জনস্বার্থের বদলে কর্পোরেট স্বার্থে পরিচালিত হবে কি না—এমন প্রশ্ন উঠেছে।
তহবিলের ক্ষেত্রেও উদ্বেগ প্রবল। কয়েকটি রাজ্য ইতিমধ্যেই আশঙ্কা জানিয়েছে—পূর্ণ কেন্দ্রীয় সহায়তার বদলে ৬০:৪০ অনুপাত চালু হলে আর্থিক বোঝা রাজ্যগুলির ওপর পড়বে এবং সমতা ভিত্তিক শিক্ষা অধিকারের ধারণা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
সামগ্রিক ভাবে, HECI বিল ২০২৫ উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের বিভাজন, বহুস্তরীয় অনুমোদন এবং নিয়ন্ত্রক দ্বৈতকরণ দূর করার একটি বড় প্রশাসনিক সংস্কার হিসেবে সামনে আসছে। তবে এই সংস্কার কতটা গণতান্ত্রিক হবে, প্রতিষ্ঠানগুলির স্বাধীনতা ও গবেষণার স্বাধীনতা রক্ষা করতে পারবে কি না, আর রাজ্য ও সামাজিক প্রতিনিধিত্ব বাস্তবিক অর্থে নিশ্চিত করা হবে কি না—সেই সব প্রশ্নের উত্তরই শেষ পর্যন্ত বিলের বাস্তবায়ন নির্ধারণ করবে।
এই বিল ভারতের উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ নির্ধারণে একটি মোড় পরিবর্তনের মুহূর্ত তৈরি করেছে—কিন্তু তা উন্নয়নের দিকে এগোবে, নাকি কেন্দ্রীকরণ ও অসমতার নতুন অধ্যায় লিখবে—তা এখন দেখার অপেক্ষা।
