আজকাল ওয়েবডেস্ক: বলিউডি সিনেমা বা শহুরে মধ্যবিত্ত সমাজে ‘লিভ-ইন রিলেশনশিপ’কে অনেকেই আধুনিকতা বা পাশ্চাত্য প্রভাবের ফল বলে মনে করেন। কিন্তু ভারতের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের রাজস্থান রাজ্যে বসবাসকারী একটি আদিবাসী সমাজের কাছে এই জীবনযাপন কোনও নতুন ধারণা নয়—বরং তা হাজার বছরের পুরনো এক সামাজিক প্রথা।

রাজস্থান ও গুজরাটের কিছু অংশে বসবাসকারী গারাসিয়া আদিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে বিবাহ ছাড়াই একসঙ্গে বসবাস করার রীতি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসছে। এই প্রথা স্থানীয়ভাবে পরিচিত ‘ডাপা’ নামে। নির্দিষ্ট সামাজিক আচার ও রীতির মাধ্যমে এই সম্পর্ককে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, যদিও আনুষ্ঠানিক বিয়ের কোনও বাধ্যবাধকতা থাকে না। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, এই ব্যবস্থার ফলে গারাসিয়া সমাজে ধর্ষণ বা পণজনিত মৃত্যুর মতো অপরাধের হার অত্যন্ত কম, এবং নারীরা তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি সামাজিক মর্যাদা ভোগ করেন।

কোটরা অঞ্চলের আদিবাসী সমাজ নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করা সাংবাদিক শাহিদ পাঠান জানাচ্ছেন, গারাসিয়া সমাজের মানুষের জীবিকা মূলত কৃষিকাজ ও দিনমজুরির উপর নির্ভরশীল। “তারা তখনই বিয়ে করেন, যখন অর্থনৈতিকভাবে প্রস্তুত হন,” বলেন তিনি। “অনেক সময় সেটি জীবনের অনেক পরে হয়। তার আগে যুগলেরা বছরের পর বছর একসঙ্গে থাকেন, সন্তানও জন্মায়—কিন্তু সমাজে একে কখনও ‘অবৈধ’ বলে দেখা হয় না।”

এই প্রথার বাস্তব চিত্র সামনে আসে কোটরা অঞ্চলের একটি যৌথ বিবাহ অনুষ্ঠানে। ৭০ বছর বয়সে আদিবাসী ব্যক্তি নানিয়া গারাসিয়া তাঁর দীর্ঘদিনের সঙ্গী ৬০ বছরের কালীকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ে করেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন তাঁদের নাতি-নাতনিরা, এমনকি তাঁদের তিন পুত্র—মুগলা (৫০), গানা (৪০) ও শঙ্কর (৩৫)। বিস্ময়ের এখানেই শেষ নয়—এই তিন পুত্রও সেদিন তাঁদের নিজ নিজ লিভ-ইন সঙ্গীদের সঙ্গে একই মণ্ডপে বিয়ে করেন।

নানিয়ার দ্বিতীয় পুত্র গানা তাঁর সঙ্গীর সঙ্গে চার সন্তানের বাবা হয়েছেন, ছোট ছেলে শঙ্করের তিন সন্তান—সবাই জন্মেছে বিয়ের আগেই। কিন্তু গারাসিয়া সমাজে এই বাস্তবতা কখনও লজ্জা বা সামাজিক অস্বীকৃতির কারণ হয়ে দাঁড়ায় না। এই সমাজে সন্তান জন্মের আগে বা পরে বিয়ে করার প্রশ্নটি সম্পূর্ণভাবে অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও পারস্পরিক সম্মতির উপর নির্ভর করে।

গারাসিয়া সমাজের কিশোর-কিশোরীদের জন্য একটি বিশেষ মেলার আয়োজন করা হয়, যেখানে তারা নিজেদের পছন্দের সঙ্গী বেছে নিতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে যুগল পালিয়ে যায়, পরে গ্রামে ফিরে এসে একসঙ্গে বসবাস শুরু করে। এই সময়ে ছেলের পরিবারকে মেয়ের পরিবারকে একটি নির্দিষ্ট অর্থ দিতে হয়। এই সম্পর্ক স্থায়ী না হলে মেয়েরা আবার অন্য কাউকে বেছে নিতে পারেন, সেক্ষেত্রে নতুন সঙ্গীকে আগের সঙ্গীর তুলনায় বেশি অর্থ দিতে হয়। রাজস্থানের গামার আদিবাসীদের মধ্যেও কাছাকাছি ধরনের প্রথা দেখা যায়।

এই সমাজের সবচেয়ে ব্যতিক্রমী দিক হল—এখানে মহিলাদের সামাজিক অবস্থান পুরুষের তুলনায় বেশি শক্তিশালী। বিয়ের সমস্ত খরচ বহন করতে হয় পুরুষপক্ষকে। নানিয়া ও তাঁর ছেলেদের বিয়ের ক্ষেত্রেও সমস্ত আচার-অনুষ্ঠান হয়েছে বরপক্ষের বাড়িতে এবং ব্যয়ভারও তাদেরই বহন করতে হয়েছে।

তবে এই প্রাচীন রীতির মধ্যেও কিছু পরিবর্তন আসছে। কোটরার প্রধান গৌরী দেবী জানাচ্ছেন, আগে ডাপা প্রথা সম্পূর্ণ মৌখিক সমঝোতার উপর নির্ভর করত। এখন সেই সমঝোতাকে কাগজে লিখে রাখার প্রবণতা বাড়ছে। আধুনিক প্রশাসনিক বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার এটিই মূল পরিবর্তন।

আশ্চর্যের বিষয়, এই আদিবাসী সমাজের মানুষজন শহুরে ভারতের লিভ-ইন সম্পর্ক বা আন্তর্জাতিক সামাজিক আলোচনার বিষয়ে প্রায় কিছুই জানেন না। জোড়িওয়াদ গ্রামের প্রধান নির্মল সিং গারাসিয়া বলেন, “আমরা জানতামই না যে শহরের মানুষরাও এভাবে থাকে। এটা আমাদের সংস্কৃতি, আমরা হাজার বছর ধরে এভাবেই বেঁচে আছি।”

সমাজবিজ্ঞানী রাজীব গুপ্ত, যিনি এই প্রথা নিয়ে গবেষণা করেছেন, মনে করেন গারাসিয়া সমাজের ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে ‘বেছে নেওয়ার অধিকার’ এবং ‘প্রত্যাখ্যানের অধিকার’-এর উপর। তাঁর কথায়, “আধুনিক সমাজের বিবাহব্যবস্থা তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়, কারণ তাতে বিশেষ করে নারীর উপর নানা ধরনের নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়। আদিবাসী সমাজে গণতন্ত্র অনেক বেশি গভীরে প্রোথিত।”

এই সমাজে ‘চাদর দালনা’ নামে আরেকটি প্রথাও রয়েছে, যেখানে একজন ব্যক্তি তাঁর প্রয়াত ভাইয়ের বিধবাকে বিয়ে করেন—এ ক্ষেত্রেও নারীর সম্মতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

যে সমাজকে ভারতের মূলধারার দৃষ্টিতে প্রায়শই ‘পিছিয়ে পড়া’ বলা হয়, সেই গারাসিয়া আদিবাসীরাই হয়তো নারী-পুরুষ সম্পর্ক, সম্মতি এবং সামাজিক সমতার প্রশ্নে মূলধারার সমাজকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু শিক্ষা দিতে পারে। কারণ এই সমাজে ধর্ষণ, পণজনিত মৃত্যু বা নারীর উপর হিংসার ঘটনা তুলনামূলকভাবে অত্যন্ত বিরল—যা আজকের ভারতের জন্য এক গভীর চিন্তার বিষয়।