আজকাল ওয়েবডেস্ক: বিশ্ব যখন বিস্ময় ও অবিশ্বাস নিয়ে ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে ব্নদি হওয়ার ঘটনা দেখছিল, তখন ভারতের নীরব এবং অত্যন্ত সতর্ক বিবৃতিটি ছিল এক সুস্পষ্ট ব্যতিক্রম। নয়াদিল্লির সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম উল্লেখ করা বা সামরিক অভিযানের নিন্দা করা সচেতনভাবেই এড়িয়ে যাওয়া হয়েছিল। নর্থ ব্লকের এই অবস্থান খামখেয়ালী মার্কিন প্রেসিডেন্টকে মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে ভারতের কৌশলী কূটনৈতিক অবস্থানকেই তুলে ধরে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গোপন অভিযানের ২৪ ঘণ্টারও বেশি সময় পর দেওয়া বিবৃতিতে ভারত "গভীর উদ্বেগ" প্রকাশ করেছিল। এতে সার্বভৌমত্ব বা আঞ্চলিক অখণ্ডতার কোনও উল্লেখ ছিল না। এই নীতিগুলো ভারত ঐতিহ্যগতভাবে সমর্থন করে এবং নিজের সীমান্ত বিরোধ মোকাবিলা করার সময়ও সেগুলোর কথা বলে থাকে।
বিদেশ মন্ত্রকের সংক্ষিপ্ত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, "ভেনিজুয়েলার সাম্প্রতিক ঘটনাবলী গভীর উদ্বেগের বিষয়। আমরা উদ্ভূত পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। ভারত ভেনিজুয়েলার জনগণের মঙ্গল ও নিরাপত্তার প্রতি তার সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করছে।"
ভারতের সংযত প্রতিক্রিয়ার নেপথ্যের কারণ:
কারাকাসে "অ্যাবসোলিউট রিজলভ" নামের একটি দুঃসাহসিক সামরিক অভিযানে মার্কিন বিশেষ বাহিনী নিকোলাস মাদুরো এবং তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে বন্দি করার একদিনেরও বেশি সময় পর ভারত এই সংযত প্রতিক্রিয়া জানায়। এরপর মাদুরোকে মাদক পাচার এবং মাদক-সন্ত্রাসবাদের অভিযোগের মুখোমুখি করার জন্য নিউইয়র্কে নিয়ে যাওয়া হয়।
অভিযানটির বিস্তারিত বিবরণ এবং মাদুরোর চোখ বাঁধা ও হাতকড়া পরা ছবি প্রকাশিত হওয়ার পর অনেক দেশ বিষয়টির তীব্র সমালোচনা করে এবং এটিকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলে অভিহিত করে। গ্লোবাল সাউথের বেশ কয়েকটি প্রধান শক্তি, যাদের "কণ্ঠস্বর" হতে ভারত প্রত্যাশী, তারাও এই হাই-প্রোফাইল মার্কিন সামরিক অভিযানের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায়। ব্রাজিল বলেছে যে মাদুরোকে আটক করা একটি "সহ্যের সীমা" অতিক্রম করেছে এবং এটিকে "আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন" বলে অভিহিত করেছে।
ভারতের অবস্থানটি ২০২২ সালে রাশিয়া, ইউক্রেন আক্রমণ করার সময় নেওয়া অবস্থানের মতোই ছিল - অর্থাৎ কোনও পক্ষ না নেওয়ার নীতি। প্রকৃতপক্ষে, বিশ্বমঞ্চে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ভারতের ভোটদানে বিরত থাকা এবং নীরবতা নিয়ে বারবার প্রশ্ন উঠেছে।
ভারত ইতিমধ্যেই ৫০ শতাংশ শুল্ক নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে এবং কয়েক মাস ধরে আলোচনার পরেও একটি দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি করতে পারেনি।ফলে ভারত-মার্কিন সম্পর্ক তলানীর পথে। এই অবস্থায় ভেনিজুয়েলা অভিযানের বিষয়ে ভারতের এই সংঘাতহীন প্রতিক্রিয়া 'ক্ষুব্ধ' ট্রাম্পকে কোনও মতেই চটাবে না বলে মনে করা হচ্ছে।
ভেনেজুয়েলায় ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত ওয়াই কে সিনহা সংবাদ সংস্থা এএনআই-কে বলেছেন, "ভারতের প্রতিক্রিয়া খুবই সংযত এবং স্পষ্টতই এই পর্যায়ে তারা কাউকে দোষারোপ করতে চাইছে না। কারণ আমাদের, যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য দেশের সঙ্গে আমাদের নিজস্ব দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের কথা মাথায় রাখতে হবে। দেখুন ইউরোপীয়রাও একই কাজ করেছে।"
ভারতের প্রতি ট্রাম্পের নতুন হুঁশিয়ারি
সোমবারই ট্রাম্প আবারও ভারতকে সতর্ক করে বলেছেন যে, যদি নয়াদিল্লি রাশিয়ার থেকে তেল কেনা বন্ধ না করে, তবে আরও শুল্ক আরোপ করা হবে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। অবশ্য আগের মতোই মোদির স্তুতি করেছেন ট্রাম্প। তবে এই মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই মন্তব্যটি উত্তেজনা প্রশমনে খুব একটা কাজে আসেনি।
ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, "তারা (ভারত) আমাকে খুশি করতে চেয়েছিল... মোদি একজন ভাল মানুষ। তিনি জানতেন আমি অসন্তুষ্ট, এবং আমাকে খুশি করাটা জরুরি ছিল। যদি তারা রাশিয়ার তেলের বিষয়ে সাহায্য না করে, তবে আমরা ভারতের ওপর শুল্ক বাড়াতে পারি।"
মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এল, যখন ট্রাম্পের পাশে দাঁড়িয়ে মার্কিন সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম গত মাসে ভারতের রাষ্ট্রদূত বিনয় কোয়াত্রার সঙ্গে তাঁর একটি বৈঠকের কথা স্মরণ করেন। গ্রাহাম দাবি করেন যে, কোয়াত্রা রাশিয়া থেকে ভারতের তেল আমদানি কমে যাওয়ার বিষয়টি উত্থাপন করেছিলেন এবং তাঁকে অনুরোধ করেছিলেন যেন ট্রাম্পকে ২৫ শতাংশ পারস্পরিক শুল্কের ওপর আরোপিত অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক তুলে নেওয়ার জন্য বলেন।
২০২৫ সালের আগস্টে, ট্রাম্প রাশিয়ার তেল কেনার কারণে ভারতীয় পণ্যের আমদানির ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন। ওয়াশিংটনের দাবি, এই তেল ক্রয় আদতে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনে ইন্ধন জোগাচ্ছে।
ভারতের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের সোমবারের উস্কানিমূলক মন্তব্য, দুই মিত্র দেশের সম্পর্ককে আরও খারাপ করতে পারে।
গত বছর বাণিজ্য বিষয়ে নয়াদিল্লি ট্রাম্পের সহযোগীদের সঙ্গে ব্যাপক কূটনৈতিক যোগাযোগ শুরু সত্ত্বেও প্রেসিডেন্ট্রের হুঁশিয়ারি এড়ানো যায়নি।
ভারত ৮৫-৮৮ শতাংশ তেল আমদানি করে। ট্রাম্পের হুমকির পর, নয়াদিল্লি ইতিমধ্যেই তার জ্বালানি ক্রয়ের উৎস বহুমুখী করতে শুরু করেছে। তথ্য থেকে জানা যায় যে, ডিসেম্বরে রাশিয়ান তেল আমদানি তিন বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।
নরেন্দ্র মোদি নেতৃত্বাধীন সরকার ভেনিজুয়েলার ঘটনাটিকে গুরুত্ব না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় তা কূটনৈতিক মহলে আলোচনার একটি প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে এবং বিরোধীদের ক্ষোভের কারণ হয়েছে। কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে ভেনিজুয়েলার ঘটনায় ট্রাম্পকে স্বৈরশাসক অ্যাডলফ হিটলারের সঙ্গে তুলনা করেছেন এবং মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাছে "মাথা নত করার" জন্য প্রধানমন্ত্রী মোদির সমালোচনা করেছেন।
খাড়গে বলেন, "ফের প্রমাণিত যে- প্রধানমন্ত্রী মোদি ট্রাম্পের নিয়ন্ত্রণে আছেন। আমার 'মিস্টার ইন্ডিয়া' সিনেমার একটি সংলাপ মনে পড়ে যাচ্ছে - 'মোগাম্বো খুশ হুয়া'... আমি বুঝতে পারছি না কেন মোদি তাঁর (ডোনাল্ড ট্রাম্প) সামনে মাথা নত করছেন। এটি দেশের জন্য ক্ষতিকর।"
অতীতের দিকে তাকালে দেখা যায়, ভেনেজুয়েলার তেলের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ বা পুনর্গঠন ভারতের জন্য একটি বড় আর্থিক সুবিধা বয়ে আনতে পারে। মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর ট্রাম্প বলেছিলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের বৃহত্তম তেল মজুতের অধিকারী ভেনেজুয়েলার তেল শিল্পের নিয়ন্ত্রণ নেবে। তবে, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এবং অব্যবস্থাপনার কারণে ভেনেজুয়েলা গোটা বিশ্বের মাত্র এক শতাংশেরও কম তেল উৎপাদন করে।
বস্তুত, ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার আগে ভারত একসময় ভেনেজুয়েলার অপরিশোধিত তেলের অন্যতম বৃহত্তম ক্রেতা ছিল। এই পদক্ষেপের ফলে ওএনজিসি বিদেশ-এর প্রায় এক বিলিয়ন ডলারের পেমেন্ট আটকে যায় এবং ভারতীয় সংস্থাগুলোর পরিচালিত তেলক্ষেত্রগুলো বন্ধ হয়ে যায়। সুতরাংমার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ ভেনেজুয়েলার অপরিশোধিত তেল রপ্তানি ফের শুরু করার সুযোগ করে দেবে।
