আজকাল ওয়েবডেস্ক: ভারত সরকার স্মার্টফোন নির্মাতাদের দেশের সমস্ত নতুন ডিভাইসে আধার অ্যাপ আগে থেকেই ইনস্টল বা 'প্রিলোড' করে রাখার নির্দেশ দিয়েছে। তবে অ্যাপল, স্যামসাং এবং গুগল-এর মতো নির্মাতারা সরকারের এই অনুরোধের তীব্র বিরোধিতা করেছে। মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে, 'সঞ্চার সাথী' অ্যাপের ক্ষেত্রেও একই একটি নির্দেশ জারি করা হয়েছিল। তবে সেই নির্দেশটিও তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়ে। 

আধার হল সরকারের একটি বায়োমেট্রিক পরিচয় কর্মসূচি, যার আওতায় ১.৩৪ বিলিয়ন নাগরিক নথিভুক্ত রয়েছেন। 

রয়টার্সের একটি প্রতিবেদন অনুসারে, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে কেন্দ্রীয় সরকার গোপনে ফোন নির্মাতাদের কাছে আধার অ্যাপটি প্রিলোড করার প্রস্তাব পেশ করেছিল। এই অনুরোধটি এসেছিল ইউআইডিএআই-এর (UIDAI) পক্ষ থেকে। উল্লেখ্য, ইউআইডিএআই আধার কর্মসূচি পরিচালনা করে। ইউআইডিএআই, তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রকের কাছে অনুরোধ জানিয়েছিল যেন তারা অ্যাপল ও স্যামসাং-এর মতো স্মার্টফোন নির্মাতাদের সঙ্গেও এই প্রস্তাবটি নিয়ে আলোচনা করে।

এই ব্যবস্থা কার্যকর হলে, ভারতে বিক্রি হওয়া প্রতিটি স্মার্টফোনেই বায়োমেট্রিক পরিচয় অ্যাপটি (আধার আ্যাপ)  আগে থেকেই ইনস্টল করা থাকত। অর্থাৎ, নতুন ফোনটি চালু বা সেট-আপ করার সময়ই ব্যবহারকারীরা অ্যাপটি ফোনে দেখতে পেতেন - ঠিক যেমন ঘড়ি বা ক্যালকুলেটরের মতো অ্যাপগুলো ফোনে আগে থেকেই ইনস্টল করা থাকে।

স্মার্টফোন নির্মাতাদের বিরোধিতা:
মোবাইল ফোন নির্মাতাদের সংগঠন 'ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন ফর ইনফরমেশন টেকনোলজি' (এমএআইটি)সরকারের এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছে। বিশেষ করে অ্যাপল এবং স্যামসাং এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা সংক্রান্ত উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বলে জানা গিয়েছে। 

উল্লেখ্য, গত বছর 'সঞ্চার সাথী' অ্যাপ সংক্রান্ত প্রস্তাবের সময়ও নির্মাতারা একই ধরনের উদ্বেগের কথা তুলে ধরেছিলেন।

এ ছাড়াও,'ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন ফর ইনফরমেশন টেকনোলজি'  জানিয়েছে যে- আধার অ্যাপ আগে থেকে ইনস্টল করতে হলে ভারত এবং রপ্তানি বাজারের জন্য তৈরি ডিভাইসগুলোর ক্ষেত্রে আলাদা আলাদা উৎপাদন ব্যবস্থা বা 'প্রোডাকশন লাইন' বজায় রাখতে হবে; যার ফলে লজিস্টিক বা সরবরাহ সংক্রান্ত জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। গত ১৩ জানুয়ারি পাঠানো একটি অভ্যন্তরীণ ইমেলে 'ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন ফর ইনফরমেশন টেকনোলজি'  স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে যে, সরকারের এই প্রস্তাবটি "বৃহত্তর জনকল্যাণ সাধনে সহায়ক হবে না।"

ভারত সরকার কেন ফোনে আধার অ্যাপ চায়?
চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে ইউআইডিএআই আধার অ্যাপটির একটি নতুন সংস্করণ চালু করেছে। এই অ্যাপের মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা তাদের ব্যক্তিগত তথ্য আপডেট করতে পারেন, পরিবারের সদস্যদের প্রোফাইল পরিচালনা করতে পারেন এবং তথ্যের অপব্যবহার রোধে তাদের বায়োমেট্রিক ডেটা 'লক' করে রাখতে পারেন।

সরকারের যুক্তি হল, ফোনে অ্যাপটি আগে থেকে ইনস্টল করা থাকলে নাগরিকদের জন্য আধার সংক্রান্ত বিভিন্ন সুবিধা বা বৈশিষ্ট্য ব্যবহার করা আরও সহজ হয়ে উঠবে। এর ফলে অ্যাপটি আলাদাভাবে ডাউনলোড করার আর কোনও প্রয়োজন হবে না এবং ব্যবহারকারীরা সহজেই আধার পরিষেবা গ্রহণ করতে পারবেন।

আধার হল ১২-সংখ্যার একটি অনন্য পরিচয় নম্বর, যা ১৩ লক্ষ ৪০ হাজারও বেশি ভারতীয় বাসিন্দার বায়োমেট্রিক তথ্যের সঙ্গে সংযুক্ত। ব্যাঙ্কিং, টেলিকম এবং বিমানবন্দরে প্রবেশের ক্ষেত্রে পরিচয় যাচাইয়ের কাজে আধার ব্যাপকভাবে ব্যবহার হয়। অতীতে বেশ কয়েকবার আধার সংক্রান্ত তথ্য ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে, যার ফলে কোটি কোটি ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্য অরক্ষিত বা উন্মুক্ত হয়ে পড়েছিল। স্মার্টফোন নির্মাতারা যুক্তি দিয়েছেন যে, রাশিয়া ছাড়া বিশ্বের অন্য কোনও দেশই স্মার্টফোনে সরকারি অ্যাপ আগে থেকেই ইনস্টল করে রাখার বিষয়টি বাধ্যতামূলক করেনি।

'সঞ্চার সাথী'-রই পুনরাবৃত্তি?
সরকার যখন 'সঞ্চার সাথী' সংক্রান্ত নির্দেশিকা প্রত্যাহার করে নিল, তার মাত্র কয়েক সপ্তাহ পরেই 'আধার' অ্যাপ আগে থেকে ইনস্টল করে রাখার এই অনুরোধটি সামনে এল। আপাতদৃষ্টিতে, পরিস্থিতিটি বেশ একই রকম মনে হতে পারে। তবে এর মধ্যে কিছু পার্থক্যও রয়েছে।

'সঞ্চার সাথী'-র ক্ষেত্রে সরকার ফোন নির্মাতাদের ওপর অ্যাপটি আগে থেকে ইনস্টল করার জন্য এক প্রকার জোর খাটাতে চেয়েছিল। অন্যদিকে, 'আধার' অ্যাপটি ইনস্টল করার বিষয়টি কোনও কঠোর নির্দেশ বা আদেশ ছিল না। বিষয়টি অনুরোধ হিসেবেই প্রস্তাব করা হয়েছে।

'সঞ্চার সাথী' অ্যাপটির ক্ষেত্রে এমনও বলা হয়েছিল যে, সফটওয়্যার আপডেটের মাধ্যমে পুরনো ফোনগুলোতেও এটা আগে থেকে ইনস্টল হয়ে যাবে এবং ব্যবহারকারীদের কাছে এটি নিষ্ক্রিয় করার কোনও বিকল্প থাকবে না। অন্যদিকে, দেখে মনে হচ্ছে যে 'আধার' অ্যাপের ক্ষেত্রে সরকার এমন কোনও পদক্ষেপ বা ব্যবস্থার কথা আলোচনা করেনি। 'সঞ্চার সাথী' অ্যাপটির মূল উদ্দেশ্য ছিল টেলিকম সংক্রান্ত জালিয়াতি প্রতিরোধ করা এবং চুরি যাওয়া ডিভাইসগুলো ব্লক করা।

আরও অ্যাপ কি আসতে চলেছে?
'আধার' অ্যাপটি হল সেই ছ'টি সরকারি অ্যাপের মধ্যে একটি, যেগুলোর বিষয়ে স্মার্টফোন নির্মাতারা ভারত সরকারের কাছে আপত্তি বা বিরোধিতা জানিয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এই অ্যাপগুলোর মধ্যে একটি হল 'সচেত' (Sachet) যা মূলত একটি দুর্যোগ সতর্কতা পরিষেবা।

ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন ফর ইনফরমেশন টেকনোলজি-এর পক্ষ থেকে ২০২৬ সালের ১০ মার্চ ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রকের আধিকারিক রবীন্দ্র কুমার মিনার কাছে লেখা একটি চিঠিতে 'সচেত' অ্যাপটি আগে থেকে ইনস্টল করার প্রস্তাবের বিরোধিতা করা হয়েছে।

ভারতের এই দৃষ্টিভঙ্গি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো অন্যান্য গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর সম্পূর্ণ বিপরীত। কারণ ওই দেশগুলোতে সরকারি অ্যাপগুলো আগে থেকে ইনস্টল করা বাধ্যতামূলক নয়। বরং তারা মূলত সুনির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রণমূলক কাঠামো এবং স্বেচ্ছামূলক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপরই অধিক গুরুত্ব আরোপ করে থাকে।